ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নদীভাঙনে বিপন্ন চরবংশী

নদীভাঙনে বিপন্ন চরবংশী

নদীর দিকে তাকাইলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। এই ঘরটা বানাইতে কত কষ্ট করছি, এখন মনে হয় সবকিছু চোখের সামনে ভাসাইয়া নিয়ে যাবে নদী। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ২ নম্বর চরবংশী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গরম বাজার এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম। তভর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তানদের মুখেও অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। নদীভাঙনের হুমকিতে থাকা এই পরিবারের মতো একই দুর্ভোগে দিন কাটছে এলাকার শতাধিক পরিবারের।

সরেজমিন দেখা যায়, গরম বাজার সংলগ্ন নদীতীরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর তীব্র স্রোতে পাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়েছে। কয়েকটি বসতঘর এখন ভাঙনের একেবারে কিনারায় অবস্থান করছে। কোথাও কোথাও ঘর থেকে নদীর দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট। নদীর পাড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টি কিংবা জোয়ার এলেই নতুন করে মাটি ধসে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় কয়েকটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, আমার বাড়ির সামনের অনেক অংশ নদীতে চলে গেছে। আগে যেখানে উঠান ছিল, এখন সেখানে নদীর পানি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি নতুন করে মাটি ভাঙছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে ঘর সরানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

একই এলাকার গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, রাত হলেই ভয় লাগে। বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমাইতে পারি না। বৃষ্টি হইলে মনে হয় এই বুঝি ঘরটা নদীতে পড়ে গেল। আমরা গরিব মানুষ, ঘর হারাইলে কোথায় যামু? স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। নদীর ধার ঘেঁষে থাকা বেশ কয়েকটি পরিবার এরই মধ্যে তাদের ঘরবাড়ি সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ মূল্যবান জিনিসপত্র আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেকে আবার বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজ করছেন। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা হাবিব উল্লাহ বলেন, এই এলাকায় নদীভাঙন নতুন না। কিন্তু এবার পরিস্থিতি খুব খারাপ। আগে ধীরে ধীরে ভাঙতো, এখন এক রাতেই কয়েক ফুট মাটি নদীতে চলে যায়। আমরা অনেক পরিবারকে এই নদীর কারণে সর্বস্ব হারাইতে দেখছি।

স্থানীয় কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, শুধু বসতভিটা নয়, নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমিও। তিনি বলেন, আমার প্রায় আধা একর জমি নদীতে চলে গেছে। এই জমির ফসল দিয়েই সংসার চলতো। এখন জমিও নাই, আয়ের পথও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। স্থানীয় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, গরম বাজার এলাকার অনেক মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে। বাজার, রাস্তা ও বসতবাড়ি, সবকিছু ঝুঁকিতে। আমরা বারবার প্রশাসনের কাথছে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু এখনও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভাঙনকবলিত এলাকায় কখনও জিওব্যাগ ফেলা বা স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় স্থানীয়দের। স্থানীয় যুবক সোহেল রানা বলেন, আমরা বহুবার জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত ভাঙন রোধে কোনো দৃশ্যমান কাজ হয়নি। নদী প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের বসতভিটা গিলে খাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পুরো এলাকাই একদিন নদীতে চলে যাবে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তবে আশ্বাসে খুব একটা আস্থা পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন, কিন্তু বাস্তবে ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে প্রতিদিন নদীর দিকে তাকিয়ে আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিমের কণ্ঠে ছিল গভীর উদ্বেগ, পুরাপুরি বর্ষা এখনও শুরুই হয়নি। এর মধ্যেই নদী যেভাবে পাড় ভাঙতেছে, তাতে বর্ষা আইলে কী হইবো, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না। এখনই যদি ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারাইয়া পথে বসবে।

চরবংশীর নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙনের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ ঘরগুলো যেন নীরবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। নদী এখানে শুধু মাটি ভাঙছে না; ভাঙছে মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু। আর তাই নদীর গর্জনের সঙ্গে মিশে আছে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস, পুরাপুরি বর্ষা না আসতেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বর্ষা এলে আমাদের কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা চরবংশীর নদীভাঙন কবলিত মানুষের কাছে। এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী গোকুল চন্দ্র পাল বলেন, রায়পুর উপজেলার প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গত শুক্রবার পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মহাঃ এনামূল হক ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত