ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুন্দরবন উপকূলে মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

সুন্দরবন উপকূলে মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাতবিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জসহ উপকূলে মাছ চাষ গত কয়েক বছরে অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুকুর, হ্রদ এবং নদী ভরাট করে তৈরি আধুনিক একিউয়াকালচারের মাধ্যমে দেশের মৎস্য উৎপাদন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মৎস্যখাত শুধু দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে না, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তিও, যেখানে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলাশয়ও ক্রমেই কমছে। যুগ যুগ ধরে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করা জেলে পরিবারের সদস্যরা এখন কম মাছ পেয়ে বিপন্ন হচ্ছেন। তবুও গ্রামীণ বাংলাদেশে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি আজও সত্য। ছোট পুকুর খনন, ঘরে ঘরে হ্যাচারি তৈরি এবং দীর্ঘ ঘণ্টার পরিশ্রমের মাধ্যমে গ্রামের মানুষরা ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন এক সমৃদ্ধ মাছ চাষ শিল্প। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে বাঙালির ভাতের থালা থেকে মাছ আজও হারায়নি।

বাংলাদেশে মাছ চাষ গত কয়েক দশকে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট উৎপাদন ৫০ লাখ টনেরও বেশি হয়েছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে খামারভিত্তিক চাষ থেকে। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে দেশে মোট মাছ উৎপাদনের মাত্র ১৬ শতাংশ আসত খামার থেকে। তখন দেশের মোট মাছের চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পূরণ হতো নদী, হাওর আর প্লাবনভূমি থেকে আহরিত প্রাকৃতিক মাছের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রাকৃতিক উৎসের উৎপাদন প্রায় একই থাকলেও, চাহিদার মাত্র ২৮ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। বাকিটা আসে খামারভিত্তিক চাষ থেকে। দেশে প্রায় ৮ দশমিক ৭ লাখ হেক্টর পুকুর, খাল ও জলাভূমি খামারভিত্তিক মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

খামারভিত্তিক মাছ চাষ দেশের মোট জিডিপির ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২২ শতাংশে অবদান রাখছে। এটি প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ ২ কোটি মানুষের জীবিকার উৎস। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। মাছ চাষের এই সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, পুষ্টিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৬৭ দশমিক ৮ গ্রাম মাছ খাচ্ছেন, যা সরকারের লক্ষ্যমান ৬০ গ্রাম অতিক্রম করেছে। গত দশকে চাষ হওয়া পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ার মতো মাছ গ্রামীণ সাধারণ পরিবারগুলোর ভাতের থালায় ইলিশ, রুই, কাতলার মতো দামী দেশি মাছের স্থান দখল করেছে।

বাংলাদেশের পুকুর ও খালভিত্তিক মাছ চাষে গত তিন দশকে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এই সময়ে দেশের মোট মাছ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৫ গুণ, যা বিশ্বে একটি অনন্য সাফল্যের নজির। এর ফলে বাজারে মাছের সহজ লভ্যতা বেড়েছে, দামও তুলনামূলকভাবে মানুষের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো সহজ হয়েছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বব্যাপীও মাছ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে মাছ উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর চীন, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এখন বৈশ্বিক মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে মাছ চাষ এখন এক নতুন সাফল্যের যুগে পৌঁছেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত পদ্ধতির ব্যবহার উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে মোট মাছ উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ টনে, যার মধ্যে ৩২ লাখ টন এসেছে খামারভিত্তিক চাষ থেকে। এখন দেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ৭৫ শতাংশ বাণিজ্যিকভাবে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে মাছ চাষ নিছক একটি পেশা নয়, বরং এক নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে এটি গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বাংলাদেশ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং চাষকৃত মাছ উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক হ্যাচারির সম্প্রসারণ, মানসম্মত খাদ্য শিল্পের বিকাশ এবং সরকারের দূরদর্শী নীতি এই সাফল্যের মূল চালিকা শক্তি। এর ফলে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত