
বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ডিজিটাল জেলা যশোর। এই জেলার মানুষ ডিজিটাল সেবা পাবে বলে আশায় বুক বেধেছিলেন। কিন্তু সেই গুড়ে বালি! সময়ের ব্যবধানে ডিজিটাল কাজ-কারবার যেন উবে গেছে। খোদ সরকারি ও স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল কর্মকাণ্ডে অনীহা তৈরি হয়েছে। এ কারণে জেলার ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট আপডেট হচ্ছে না। যা, সেবাগ্রহীতাদের হতাশ করছে।
যশোর জেলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবুল কাসেম বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের সঙ্গে সংযুক্ত যশোর জেলা পোর্টালে জেলা প্রশাসন, সরকারি অফিস, স্থানীয় সরকার, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলে ১১০টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট সক্রিয় রয়েছে।
এর মধ্যে ৬০ শতাংশ অফিসের সাইটে তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের শতভাগ তথ্য হালনাগাদ নেই।’
সরকারি এসব সাইটে প্রবেশ করলে প্রথমেই নোটিশ, খবর, টেন্ডার ও চাকরি কর্নার নামে চারটি অপশন আসে। নোটিশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সভা ও বিভিন্ন কার্যক্রম, খবর সাইটে প্রোগ্রামের ছবি ও তথ্য, টেন্ডার সাইটে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার হয়ে থাকলে তা আপলোড করা হয়। এছাড়া, চাকরি কর্নারে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে মানুষের সেবা প্রাপ্তি এবং তথ্য জানা হয় সহজলভ্য। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জনগণের কাছে স্পষ্ট থাকে।
যশোর জেলা পোর্টাল ভিজিট করে দেখা যায়, জেলা প্রশাসনের সাইটে নোটিশে তথ্য হালনাগাদ আছে। নিচে কর্মকর্তাদের তালিকায় ছবিযুক্ত নাম পদবি, ই-মেইল ও মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ রয়েছে। ভূমি সেবা, আমাদের সম্পর্কে, অভ্যন্তরীণ ই-সেবা, সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেন্স চার্টার), শিক্ষা সেবা, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণী-সেবা, বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা, পর্যটন-সেবা, তথ্য অধিকার, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা, সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি, শুদ্ধাচার, জরুরি কল, স্বাস্থ্যসেবা, বাজেট অপশন রয়েছে জেলা প্রশাসনের পোর্টালে। ফটো গ্যালারি ও ভিডিও গ্যালারিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের স্থির চিত্র ও ভিডিও আপলোড করা আছে।
এছাড়া, সরকারি তথ্য ও সেবা নম্বর ৩৩৩, জরুরি সেবা ৯৯৯, ফায়ার সার্ভিস হটলাইন ১০২ এবং বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি) ১৬১০৭ নম্বরসহ বিভিন্ন হটলাইন ও জরুরি কল সেন্টার নম্বর পাওয়া যায় সরকারি এসব সাইটে। এতে মানুষের সহজে সেবা পাবে।
পুলিশ ডট যশোর সাইটে জেলা পুলিশের কার্যক্রমের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা আছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের নামের তালিকায় বেশকিছু কর্মকর্তার ছবি আপলোড নেই। ফটো গ্যালারিতে নিয়মিত ছবি দেখা গেলেও ভিডিও গ্যালারিতে ২০২১ সালের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিডিও আপলোড রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাইটে নোটিশ, খবর, টেন্ডার ও চাকরির কর্নার ফাঁকা রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবার ছবি নেই। কিছু নেই ফটো ও ভিডিও গ্যালারিতে। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা সাইটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছবিযুক্ত তথ্য থাকলেও নোটিশ, খবর, টেন্ডার, চাকরি কর্নারে কিছু নেই।
বিএসটিআই সাইটে নোটিশ, খবর, চাকরির কর্নারে তথ্য হালনাগাদ রয়েছে। সাত কর্মকর্তার ছবিযুক্ত নামের তালিকা আছে। ফটো গ্যালারিতে ২০২৫ সালের একটি ছবি থাকলেও ভিডিও গ্যালারি ফাঁকা পড়ে আছে। ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের হটলাইন ১০২ স্ক্রলিং করাসহ সব তথ্যই মোটামুটি আপডেট পাওয়া গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবার ছবিযুক্ত নামের তালিকা পাওয়া গেলেও ফটো গ্যালারিতে ২০২৫ সালের পরে কোনো ফটো আপলোড করা হয়নি। ভিডিও গ্যালারিতে ২০১৯ সালে একটি ভিডিও লিংক থাকলেও তা দেখা যাচ্ছে না।
জেলা কারাগারের পোর্টালে কর্মকর্তাদের ছবিযুক্ত নামের তালিকা থাকলেও কর্মচারীদের সাইট দেখা যায় না। এই অফিসের ফটো গ্যালারি আপডেট থাকলেও ভিডিও গ্যালারি ফাঁকা।
জেলা শিক্ষা অফিস যশোরের সাইটে কর্মকর্তাদের সবার ছবিযুক্ত নামের তালিকা আছে। তবে কর্মচারিদের সবার ছবি নেই। ফটো গ্যালারিতে ২০২১ সালে ফটো এবং ২০১৮ সালের ভিডিও রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সব কর্মকর্তার ছবি নেই। ২০২১ সালের ফটো থাকলেও ভিডিও গ্যালারি ফাঁকা। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাইটে নোটিশ, খবর, টেন্ডার, চাকরি কর্নার ফাঁকা পড়ে আছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছবিযুক্ত নামের তালিকা থাকলেও ফটো গ্যালারিতে ২০১৮ সালের পর আর কোনো ছবি আপলোড করা হয়নি। ভিডিও গ্যালারিতে ২০২৫ সালের ভিডিও রয়েছে।
বিআরটিএ সাইটে নোটিশ, খবর, টেন্ডার, চাকরি কর্নার ফাঁকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবার ছবি নেই। সহকারী পরিচালক দেবাশীষ বিশ্বাসসহ তিন কর্মকর্তার নামের পাশে যে মোবাইল নম্বর দেওয়া রয়েছে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। ফটো গ্যালারিতে ২০২২ সালের ছবি।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সাইটেও তথ্য হালনাগাদ নেই। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মিঠু কুমার বলেন,‘আমাদের কার্যক্রম সব ঢাকার সাইটে আপডেট করা হয়। আমাদের আইসিটি দেখাশোনার নির্দিষ্ট লোক নেই। যতটুকু তথ্য আছে মূল সাইটে আছে।’
ঠিক এই অবস্থায় রয়েছে জেলার অধিকাংশ সরকারি দপ্তরের পোর্টালগুলো।
জেলা কালচারাল অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের কার্যক্রম শিল্পকলা একাডেমির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে আপলোড করা হয়। পোর্টালে নিয়মিত আপলোড করার বিষয়টা সেভাবে খেয়াল করা হয়নি। পুরাতন কাঠামো অনুযায়ী আমাদের অফিস চলছে। এজন্য জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মূলত এই কাজটি করে থাকেন। আমরা এই বিষয়টি আমলে নিলাম আপডেট করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জেলা আইসিটি অফিসার আবুল কাসেম বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসনকে ওয়েব পোর্টালগুলো আপডেট করার বিষয়ে অবহিত করেছি। এ বিষয়ে ২১ জুন আমাদের দপ্তর থেকে একটি রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। সরকারি অফিসের সাইটগুলো স্ব স্ব অফিস স্বেচ্ছায় আপডেট করে থাকে। নতুন কারে ওয়েব পোর্টালের ডোমেইন হোস্টিংয়ের ফ্রেম ওয়ার্কে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
যেহেতু তারা স্বেচ্ছায় অপাডেট করছেন না বা অসুবিধায় পড়েছেন এজন্য তাদের সমস্যা সমাধানে আইসিটি অফিস হতে আগামী মাস থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।’