ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

উপকূলের লবণাক্ত মাটিতে আম-পেয়ারার স্বপ্ন

গবেষণায় বদলাচ্ছে সম্ভাবনার মানচিত্র
উপকূলের লবণাক্ত মাটিতে আম-পেয়ারার স্বপ্ন

উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। এসব কারণে বছরের পর বছর দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা উৎপাদন ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তবে প্রতিকূল এ বাস্তবতার মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, লেবুখালী, পটুয়াখালী। দেশি ফলের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নত জাতের আম নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় ইতোমধ্যে মিলেছে বেশ কিছু আশাব্যঞ্জক ফলাফল। গবেষকরা বলছেন, একাধিক মৌসুমের পরীক্ষায় সফলতা মিললে দক্ষিণাঞ্চলেও বিদেশি উন্নত জাতের আমের বাণিজ্যিক চাষের পথ উন্মুক্ত হতে পারে।

দুমকী উপজেলার লেবুখালীতে অবস্থিত গবেষণা কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় অঞ্চলের উপযোগী ফলের জাত নির্বাচন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে। চলতি ২০২৪-২৫ মৌসুমে কেন্দ্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩১টি বিদেশি (এক্সোটিক) আমের জার্মপ্লাজম নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে। এসব জাতের অভিযোজন ক্ষমতা, ফলন, ফলের আকার, রং, স্বাদ, মিষ্টতার মাত্রা, খাওয়ার উপযোগী অংশ, সংরক্ষণক্ষমতা এবং রোগ সহনশীলতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষাধীন ৩১টি জাতের মধ্যে ছয়টি জাতে আকর্ষণীয় লাল খোসার আম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো- মিয়াজাকি (গও চক-০১৮), লেডি জেন (গও চক-০২১), চিয়াংমাই (গও চক-০২৬), তাইওয়ান রেড (গও চক-০৩২), কুজাই (গও চক-০৩৪) এবং কিং চাকাপাত (গও চক-০৩৯)। দেশে লাল খোসার আম এখনও বিরল। ফলে বাজারে এসব জাতের চাহিদা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষণায় সবচেয়ে বড় আকৃতির আম পাওয়া গেছে ব্রুনাই কিং (গও চক-০৪২) জাত থেকে। একটি আমের ওজন রেকর্ড করা হয়েছে ২ হাজার ৩৫১ গ্রাম, যা প্রায় আড়াই কেজির সমান। সাধারণ বাজারে বিক্রি হওয়া আমের তুলনায় এটি কয়েক গুণ বড়। ফলের গুণগত মান মূল্যায়নেও মিলেছে উল্লেখযোগ্য তথ্য। চিয়াংমাই (গও চক-০২৬) জাতের আমে ৮১ শতাংশ খাওয়ার উপযোগী অংশ (ঊফরনষব চড়ৎঃরড়হ) পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষাধীন সব জাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ আঁটি ও খোসার তুলনায় এ জাতের শাঁসের পরিমাণ অনেক বেশি। অন্যদিকে সাদা দোফালা (গও চক-০২২) জাতে ২৬ শতাংশ ব্রিক্স (ইৎরী) বা দ্রবণীয় শর্করা পাওয়া গেছে, যা এর উচ্চ মিষ্টতার প্রমাণ বহন করে। ফলনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে চিয়াংমাই জাত। গবেষণায় এ জাতের সম্ভাব্য উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ২ দশমিক ৭৩ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া কিংস্টন প্রাইড (গও চক-০৩৩) ও কাটিমন (গও চক-০১৭) জাতও উচ্চ ফলনের সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চোকানোন (গও চক-০৪০) জাতের আমে মৌসুমের বাইরে ফল ধারণের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত হওয়া। দেশে সাধারণত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমের মৌসুম থাকে। অফ-সিজনে ফল ধরার এ বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে কৃষকরা মৌসুমের বাইরেও আম উৎপাদন করে বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন। সংরক্ষণক্ষমতার দিক থেকেও কিছু জাত ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, বানানা ম্যাঙ্গো (গও চক-০১৫) ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৯ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে দূরবর্তী বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও তা বিশেষ সুবিধা দেবে। গবেষণা শুধু আমেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে জলাবদ্ধ এলাকায় বারোমাসি পেয়ারা এবং লবণাক্ত পরিবেশে আম ও পেয়ারা চাষের উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও চলছে। উপকূলের প্রতিকূল পরিবেশে কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করাই এ গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।

গবেষণা কেন্দ্রের পাশাপাশি মাঠপর্যায়েও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কাজ চলছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত চারা সরবরাহ, বাগান ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক ফলচাষ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় ফলচাষে আগ্রহ বাড়ছে।

দুমকী উপজেলার কৃষক মো. আব্দুল করিম বলেন, বারির পরামর্শে কয়েক বছর আগে আমের বাগান করেছি। আগে মনে হতো উপকূলে বিদেশি আম হবে না। এখন গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দেখে আমাদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।

বাউফলের কৃষক মোছা. রেহানা বেগম বলেন, পেয়ারার পাশাপাশি এখন আমচাষের দিকেও ঝুঁকছি। যদি গবেষণায় সফল জাতগুলোর চারা সহজে পাওয়া যায়, তাহলে অনেক কৃষকই বাণিজ্যিকভাবে আমচাষে আগ্রহী হবেন।

মির্জাগঞ্জ উপজেলার কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ধানের পাশাপাশি ফলচাষ করলে ঝুঁকি কমে। তবে উন্নত চারা, বাজার ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

বারির আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখেই গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদেশি আমের জার্মপ্লাজমগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা, ফলন, গুণগত মান ও সংরক্ষণক্ষমতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধ এলাকায় বারোমাসি পেয়ারা এবং লবণাক্ত পরিবেশে ফলচাষের উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, গবেষণায় গও চক-০১৩ ও গও চক-০২৫ বাদে অধিকাংশ জাতই ফলের আকার, রং, গুণগত মান, খাওয়ার উপযোগী অংশ, সংগ্রহকাল ও সংরক্ষণক্ষমতার দিক থেকে আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। তবে গবেষণা এখনও চলমান। একাধিক মৌসুমের তথ্য বিশ্লেষণ শেষে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য উপযোগী জাত চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হবে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষির বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। সেই প্রেক্ষাপটে বারির এই গবেষণা শুধু নতুন একটি আমের জাত খোঁজার প্রচেষ্টা নয়; বরং উপকূলের কৃষিকে আরও লাভজনক, টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল করে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। গবেষণার সফল প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলে বিদেশি উন্নত জাতের আমের বাণিজ্যিক চাষের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে বাড়বে কৃষকের আয়, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতে রপ্তানি আয়েরও সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত