
লক্ষ্মীপুরের এ-শ্রেণির রায়পুর পৌরসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি সড়ক-উপজেলা পরিষদ সড়ক ও মহিলা কলেজ সড়ক-টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে যেন কাদার সাগরে পরিণত হয়েছে। চলমান সড়ক উন্নয়নকাজের ধীর গতির কারণে পুরো সড়কজুড়ে কাদা, বড় বড় গর্ত ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ পথচারীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে রায়পুর মহিলা কলেজ সড়কের প্রায় পুরো অংশ কাদা ও পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গভীর কাদা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ভারী যানবাহনের চাপে সড়কের ওপর গভীর খাঁজ তৈরি হয়েছে।
ফলে রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল প্রায়ই কাদায় আটকে যাচ্ছে। পথচারীদেরও চরম দুর্ভোগের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। মহিলা কলেজ সড়কটি রায়পুর পৌর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই সড়কেই অবস্থিত রায়পুর মহিলা কলেজ, দুটি বড়ো আবাসিক মাদ্রাসা, রায়পুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, কয়েকটি এনজিওর কার্যালয়, একটি বেকারি এবং অসংখ্য ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন এনজিওতে সেবা নিতে আসা গ্রাহক, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সেবাপ্রত্যাশী এবং সাধারণ মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সড়কটি কাদা ও পানিতে ডুবে থাকায় সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী পোশাক নষ্ট করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও ক্রেতা সংকটে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে উপজেলা পরিষদ সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তে পানি জমে থাকায় গর্তের গভীরতা বোঝা যাচ্ছে না। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চালকদের অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। বৃষ্টির কারণে সড়কের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচলের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হানিফ নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, রাস্তার এমন বেহাল অবস্থার কারণে ক্রেতাদের সংখ্যা কমে গেছে। শিক্ষার্থীরা সময়মতো কলেজ ও মাদ্রাসায় পৌঁছাতে পারছেন না। অনেক অভিভাবক ছোট শিশুদের নিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
শরীফ নামে একজন অটোরিকশাচালক বলেন, একবার কাদায় আটকে গেলে যাত্রী নামিয়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি তুলতে হয়। এতে সময়ও নষ্ট হয়, আবার গাড়িরও ক্ষতি হচ্ছে। রাবেয়া নামে মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, এ-শ্রেণির পৌরসভায় এমন রাস্তা কল্পনাও করা যায় না। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে কলেজে। ভূইয়া রায়হান কামাল নামে স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ১ বছরের জায়গায় প্রায় চার বছর ধরে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ চললেও এখনও পুরো প্রকল্প শেষ হয়নি। ড্রেনের এক পাশের নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রায় দুই মাস ধরে ড্রেনের ঢাকনা (স্ল্যাব) বসানো হয়নি। ফলে পথচারীরা ড্রেনের ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারছেন না। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে কাদা মাড়িয়ে চলাচল করছেন, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। মাদ্রাসা ভ্যানচালক বলেন, সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। গতকালও ছুটি শেষে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময় কাদায় পিছলে একটি ভ্যান উল্টে যায়। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হলেও গুরুতর কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে বড় চিন্তা হয় কীভাবে হাসপাতালে নেওয়া যাবে। এই কাদাময় রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স তো দুরের কথা, রিক্সাও ঢুকতে চায় না। ফলে অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রোগীকে কোলে বা কাঁধে করে অনেক কষ্ট করে মূল সড়কে নিয়ে যেতে হয়। এমন অবস্থা আর কতদিন চলবে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ-শ্রেণির পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ এসব সড়কের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতিতে চলছে। বৃষ্টির মধ্যে জনদুর্ভোগ কমাতে পৌরসভার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সাময়িক ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় তদারকি চোখে পড়েনি। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার পাশাপাশি অন্তত বর্ষা মৌসুমে ইটের খোয়া বা বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। রায়পুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মাহমিদুন নবী বলেন, সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে কাজের গতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়দের ভাষ্য, রায়পুর পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রের এসব সড়কের বর্তমান অবস্থা একটি এ-শ্রেণির পৌরসভার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বর্ষার বাকি সময় আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও জনভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।