ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পাহাড়িদের ঐতিহ্য জুম চাষ

পাহাড়িদের ঐতিহ্য জুম চাষ

বান্দরবান পার্বত্য জেলা মধ্যে আলীকদম উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা তৈইন খাল বা মাতামুহুরির মতো নদীগুলোর অববাহিকায় এবং উঁচু পাহাড়ের ঢালে যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে এক আদিম ও অনন্য জীবনব্যবস্থা। পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘জুম চাষ’। এটি শুধু এক প্রকার কৃষি পদ্ধতিই নয়, বরং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের জীবন দর্শন, উৎসব এবং টিকে থাকার প্রধান ধমনী। পাহাড়িদের বারো মাসের জীবন আবর্তিত হয় জুমের ঋতু চক্রকে কেন্দ্র করে। প্রকৃতির সঙ্গে মিতালী করে তারা বছরের প্রতিটি মাসকে ভাগ করে নেন কাজের হাত ধরে:

পাহাড় নির্বাচন ও জঙ্গল কাটা (পৌষ-চৈত্র) প্রতি বছর পৌষ-মাঘ (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) মাসে জুমের জন্য উপযুক্ত পাহাড় নির্বাচন করা হয়। এরপর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে জুমের জঙ্গল কেটে রোদে শুকানো হয়।

চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগে শুকনো জঙ্গল পুড়িয়ে জুমের জমি চাষের উপযোগী করা হয়। আগুনে পুড়ে যাওয়া ছাই মাটির উর্বরতা শক্তি প্রাকৃতিকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

বৈশাখণ্ডজ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়েই শুরু হয় বীজ বপনের উৎসব। পাহাড়ের ঢালে কোদাল বা দা দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে একসঙ্গে একই জমিতে ধান, মারফা (পাহাড়ি শসা), তুলা, তিল, আদা, হলুদ এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফলের বীজ বুনে দেওয়া হয়।

এই মিশ্র চাষপদ্ধতি জুমের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবগুলোর সঙ্গে জুম চাষের রয়েছে এক আত্মিক ও গভীর সংযোগ। জুমের ফসল শুধু পেট ভরায় না, মনকেও রাঙিয়ে তোলে।

শরৎ ও হেমন্তে জুমের ফসল ঘরে তোলার আনন্দকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে উদযাপিত হয় ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব। জুমের নতুন চালের ভাত, জুমের সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’ রান্না এবং পাড়ায় পাড়ায় আনন্দের জোয়ার নামে। জুম কাটার কঠিন পরিশ্রমে ক্লান্তি দূর করতে তরুণ-তরুণীদের মুখে ভেসে ওঠে সুরময় জুমের গান। তঞ্চঙ্গ্যা রমণীরা তাদের নিজেদের কোমর তাঁতে বোনা বর্ণিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক (পিনন-খাদি) পরে যখন জুমের ক্ষেতে ফসল তুলতে যান, তখন পাহাড়ের সবুজ ঢাল যেন এক জীবন্ত ক্যানভাসে রূপ নেয়। জুম চাষ পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। শত শত বছর ধরে এই জুম চাষকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের সমাজ ব্যবস্থা, ভাষা, গান ও রূপকথা। আধুনিক যুগে এসে সমতল ভূমির মতো চাষাবাদের সুযোগ না থাকায়, এই খাড়া পাহাড়ের ঢালই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

জুম চাষ শুধু পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে বীজ বোনা নয়; এটি প্রকৃতির বুকে আদিবাসী মানুষের ঘাম, শ্রম আর সংস্কৃতির এক যৌথ মহাকাব্য।

জলবায়ুর পরিবর্তন এবং পাহাড়ের রূপান্তরের কারণে বর্তমানে জুম চাষ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তবে এখনও আলীকদমের তৈইন খাল কিংবা মাতামুহুরির উপত্যকায় জুমের নতুন ধানের গন্ধ পাহাড়ি মানুষের মুখে হাসি ফোটায়।

আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী জীবনব্যবস্থা ও জুমের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার অর্থ হলো পাহাড়ের আদিম রূপ এবং এর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত