ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ভরা মৌসুমে মিলছে না ইলিশ

ভরা মৌসুমে মিলছে না ইলিশ

ভোলার উপকূলের জেলেরা যে সময়টার জন্য মুখিয়ে থাকেন সে সময়টি ভরা মৌসুম হলেও তাদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মাছের দেখা মিলছেনা। মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর ভোলার কোনো পয়েন্টেই রূপালী ইলিশের আনাগোনা নেই। ফলে হতাশ হয়ে পড়ছেন এ অঞ্চলের অর্ধ-লক্ষাধিক জেলে। অনেকটা নির্জীব সময় পাড় করছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। বর্ষার আষাঢ়-শ্রাবণের গগনে গরজে মেঘ বর্ষায় জেলেদের যেরকম হাঁকডাক থাকে, এখানকার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে নেই সেই চিরচেনা হাঁকডাক ।

কারণ, তাদের জালে মিলছেনা রূপালি ইলিশের দেখা। ধারদেনা করে নদীতে গেলেও ফিরতে হচ্ছে অনেকটা শুন্য হাতে। নৌকাণ্ডট্রলারের মাঝি-মাল্লারা বাসায় খাওয়ার মত ইলিশও পাচ্ছেন না। ইলিশের পাইকারি ক্রেতারা নদীপানে পথ চেয়ে থাকেন। শুন্য হাতের জেলেদের দেখে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। অন্যদিকে নদীতে ইলিশ না থাকায় আড়তদার, মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকা লাভ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।

উপজেলার কয়েকটি হাটবাজারের ঘুরেও ইলিশের দেখা মিলেনি। বাজার-বন্দরে খুচরা বিক্রেতারা জানান, তারা মৎস্য অবতরণকেন্দ্র ও ইলিশ মাছের আড়তগুলোতে যোগাযোগ করেও ইলিশ মাছ পাচ্ছেন না!

ভোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র সামরাজ, খেজুর গাছিয়া মৎস্য আড়ত, পাঁচ কপাট, আটকপাট, কচ্ছপিয়া, বকসী, বেতুয়া, ঘোষেরহাট, ঢালচর ও কুকরী মুকরী মৎস্য আড়তগুলোতে ইলিশ মাছের আকালে মাছ উঠা নামানোর শ্রমিকরা শুয়ে-বসে সময় পাড় করছেন। খেজুর গাছিয়া মৎস্য আড়তের এক শ্রমিক জানান, উপজেলায় সকল মৎস্য আড়তগুলোতে প্রায় ৫ শতাধিক শ্রমিক রয়েছে। জেলেদের জালে মাছ না পড়ায় তাদের অনেকেই পেশা পাল্টাচ্ছেন।

স্থানীয় জেলেরা জানায়, ভারী বৃষ্টিপাতে নদীতে পানি বাড়লে সাগর থেকে ইলিশ মাছ নদীতে চলে আসে। এ সময় জেলেদের জালে ইলিশ মাছ ধরা পড়ার কথা। গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে নদীতে পানি বেড়েছে। ফলে মেঘনা নদীতে পানি এখন থৈ থৈ করছে। তারপরও জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না।

জেলেদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ইলিশ মাছের ভরা মৌসুম। নদীতে জাল ফেলে হন্যে হয়ে ঘুরলেও ইলিশ মাছের দেখা মিলছে না।

জোবায়ের নামে এক জেলে বলেন, অসংখ্য ডুবোচরের কারণে ইলিশ সাগর থেকে নদীতে আসছে না। ময়লা আবর্জনার কারণে নদীদূষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যার কারণে নদীতে ইলিশের বিচরণ কমেছে। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে, প্রয়োজনে নদী খনন করার দাবী জানান তিনি।

চান্দু মিয়া নামে এক জেলের সঙ্গে কথা হয়- নদীতে ইলিশের অবস্থা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, নদীতে ইলিশ মাছ নেই বলেই তো বাড়িতে বসে আছি। তিনি প্রশ্ন রেখে আরও বলেন, এ সময় কি আমাদের বাড়িতে বসে থাকার সময়?

সামরাজ মৎস্য ঘাটের আড়তদার মো. ওমর ফারুক জানান, নদীতে ইলিশের দেখা নেই বললেই চলে, দুই একটা মাছ কোন কোন ট্রলার-বোট পেলেও তাতে তাদের জ্বালানী খরচই পোষায় না। মাঝি-মাল্লারা দু’চার টাকা ভাগে না পাওয়ায় তারা এখন আর নদীতে তেমন যায়না। ধার-দেনার ভয়ে অনেক জেলে এলাকা ছেড়ে অন্য জেলায় চলে যাচ্ছেন। আমরাও নির্জীব সময় অতিবাহিত করছি।

বিচ্ছিন্ন চর ঢালচর মৎস্যঘাটের আদিবা মৎস্য আড়তের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম সুমন বলেন, আমাদের এ সময়টাতে ঢাকা-বাড়ী ইলিশ মাছ নিয়ে দৌঁড়ের ওপর থাকার সময়। কিন্তু এ বছর জেলদের জালে ইলিশ না পড়ায় আমাদের কোন ব্যস্ততা নেই। এদিক সেদিক ঘুরে এখন আমাদের সময় কাটে।

ভরা মৌসুমে ইলিশ মাছ নদীতে না আসায় বিশেষজ্ঞরা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কিছু কারণকে দায়ী করেছেন। এ ব্যাপারে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, নদীর মোহনায় অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন, উপকূলীয় এলাকায় কল কারখানার বর্জ্যরে কারণে নদী দূষণ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ফলে নদীতে ইলিশের বিচরণ পথ ও প্রজনন ক্ষেত্র অনিরাপদ হয়ে ওঠেছে। এছাড়া তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নদীতে ইলিশ মাছ আসেনি। তবে আমরা আশাবাদী গত কয়েক দিনের পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে তাতে নদীতে পানি বেড়েছে। আশা করা যায় সামনের সময়ে ইলিশ উপকূলীয় নদীতে আসবে। জেলেরা ইলিশ পাবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত