
একসময় ভরা মৌসুমে পদ্মা-মেঘনায় জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত। সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। নদীতে জেগে উঠছে অসংখ্য ছেট-বড় ও ডুবোচর, কমছে নাব্য, বাড়ছে পানিদূষণ।
এরসঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার। সব মিলিয়ে জাতীয় মাছ ইলিশের অন্যতম প্রধান অভয়াশ্রম পদ্মা-মেঘনা এখন নানা সংকটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইলিশের উৎপাদনে। শরীয়তপুরের পদ্মা নদীতে গত তিন বছরে ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
জেলা মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পদ্মা নদী থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ১ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে আহরণ হয়েছে ৩ হাজার ৭০৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে ৭৯৫ মেট্রিক টন বা প্রায় ১৮ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য এখনও হালনাগাদ হয়নি।
শরীয়তপুরের পদ্মা ও মেঘনার প্রায় ৮০ কিলোমিটার জলসীমা ইলিশের বিচরণ ও আহরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমে বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর ও নতুন চর সৃষ্টি হওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্রও পরিবর্তিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে শরীয়তপুরের পদ্মা-মেঘনা অংশে প্রায় ৩০টি ডুবোচরের কথা উঠে এসেছে।
নদীর নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি পানিদূষণও ইলিশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন নদীপথ দিয়ে শিল্পকারখানা, নগর ও গৃহস্থালি বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, কৃষিজমির সার ও কীটনাশক, নৌযানের তেল-লুব্রিকেন্ট এবং পলিথিনসহ নানা ধরনের দূষিত পদার্থ পদ্মা-মেঘনায় এসে পানিকে করে ফেলেছে জলজ প্রাণীর প্রতিকূলে।
এতে নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও বিঘ্নিত হচ্ছে। ইলিশের ডিম ও পোনার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০-৩০ বছর আগে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ যে স্বাভাবিক ও অনুকূল পরিবেশ পেত, বর্তমানে সেই পরিবেশের আমুল পরিবর্তন হয়েছে। নদীর পানিপ্রবাহ, গভীরতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি দূষণ ও মানুষের নানা ধরনের কর্মকাণ্ড ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণকে বাধাগ্রস্ত করছে। নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তলদেশের স্বাভাবিক পরিবেশ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বালু উত্তোলন, ড্রেজিং ও নদীতে ভারী নৌযানের চলাচলের কারণে ইলিশের বিচরণক্ষেত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ঠ হচ্ছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, উজান থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি এসে পদ্মার বিভিন্ন স্থানে জমা হচ্ছে। এতে নতুন চর ও ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নদীর গভীরতা কমছে এবং পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে গত ১০ বছরে শরীয়তপুর অংশে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করা হয়েছে। জাজিরা উপজেলার দুবলাডাঙ্গা এলাকার চিডারচর এলাকার জেলে মতিন মিয়া বলেন, প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করছি। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। আগে বর্ষা মৌসুমে নদীতে জাল ফেললেই বড় বড় ইলিশ ধরা পড়ত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও তেমন ইলিশ পাওয়া যায় না। নদীতে চর জেগে ওঠায় মাছের চলাচলের পথও বদলে গেছে। তাছাড়া কারেন্ট জালের পাশাপাশি অবৈধ জাল দিয়েও অবাধে জাটকা শিকার করা হচ্ছে। আবার প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশও নিধন করা হচ্ছে। এসব বন্ধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে আশঙ্কাজনক হারে ইলিশ কমে যাবে। বাংলাদেশ নদীপরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নুরুজ্জামান (সিপন) বলেন, উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত পলি জমে চর সৃষ্টি, নদী দখল, নির্বিচারে মা ইলিশ ও জাটকা নিধন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পরিকল্পনাহীন ড্রেজিং এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সার্বিক প্রভাবে ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা। এতে ইলিশসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই, ইলিশ রক্ষায় নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সহায়ক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। নয়তো নিকট অতীতে ভয়াবহ পরিণতি আমাদেরকেই দেখতে হবে।
শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, শরীয়তপুরে পদ্মা ও মেঘনা নদী ঘিরে প্রায় ৮০ কিলোমিটার জলসীমা রয়েছে। ইলিশ উৎপাদনের জন্য এ জলসীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাব্যতা সংকট, ডুবোচর, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বিভিন্ন উৎসের বর্জ্যে পানিদূষণ বাড়ছে। ২০-৩০ বছর আগে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ যে অনুকূল পরিবেশ পেত, এখন তা আর নেই বললেই চলে। ইলিশের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে মৎস্য অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ নয়, ইলিশের অভয়াশ্রমের নদী পরিবেশ রক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নদীদূষণ বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পিত ড্রেজিং, সংযোগ খাল পুনঃখনন, নিষিদ্ধ জাল নির্মূল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। তা না হলে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।