
চুক্তি অনুযায়ী ৮ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সাড়ে চার বছরেও আলোর মুখ দেখেনি টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভায় প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন 'সমন্বিত কঠিন ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট'।
এদিকে, পৌরসভার নির্দিষ্ট কোনো ডাম্পিং স্টেশন বা ময়লা ফেলার জায়গা না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিরুপায় হয়ে তারা রাস্তাঘাটের পাশে, ফসলি জমির কোণে কিংবা উন্মুক্ত পুকুড়ে যত্রতত্রময়লা-আবর্জনা ফেলছেন। ফলে পুরো আবাসিক এলাকা এখন তীব্র দুর্গন্ধের শহরে পরিণত হয়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ পানিবাহিত ও বায়ুবাহিত রোগব্যাধি। পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৫.৫২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৯টি ওয়ার্ড ও ১৮টি মহল্লা নিয়ে গঠিত 'খ' শ্রেণির কালিহাতী পৌরসভার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার । দিন দিন শহর উন্নত হলেও নাগরিক সেবা বাড়েনি। পৌরসভায় প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় টন কঠিন ও তরল বর্জ্য উৎপাদিত হয়।
ফেলে দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ আবর্জনা ও মানুষের মল-মূত্র থেকে শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে পৌরসভার নিশ্চিন্তপুর এলাকার তিন একর জমিতে এই মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ইনভাইরনমেন্টাল স্যানিটেশন প্রকল্প বাস্তবায়নে চার কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে 'সমন্বিত কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনাপ্ল্যান্ট' এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের ১ মার্চ।
পায় ঢাকার 'টার্ন-এনসি (জেভি)' নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কার্যাদেশ অনুযায়ী, আট মাসের মধ্যে কাজ শেষ করে জনস্বাস্থ প্রকৌশল অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও আজ অবধি দৃশ্যমান কোনো সুফল মেলেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্লান্টের চার পাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ শেষ হয়েছে। তবে মূল শোধন প্রক্রিয়ার অন্যতম অঙ্গ কমবাসশন মেশিনের জন্য নির্ধারিত শেড তৈরির কাজ এখনও চলছে; অর্থাৎ পুরোপুরি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়নি।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বয় করে বর্জ্য শোধনের এক বিশাল কর্মযজ্ঞের ছক আঁকা হয়েছে। কঠিন ও মানব বর্জ্য সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিশোধনের জন্য প্ল্যান্টে তৈরি করা হয়েছে— প্ল্যান্টেড ড্রায়িং বেড ও অ্যানেরোবিক ব্যাফেল রিঅ্যাক্টর (এবিআর), যা মানববর্জ্যের তরল অংশকে ক্ষতিকারক উপাদানমুক্ত করবে। কনস্ট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড ও পলিশিং পন্ড-পানিকে পুরোপুরি শোধন করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার ইউনিট। কম্পোস্ট শেড ও সর্টিং শেড— যেখানে বর্জ্য এনে জমা ও প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এ ছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য রয়েছে পার্কিং শেড, অফিস রুম এবং সিকিউরিটি রুমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ইউনিট। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্ল্যান্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এটি হবে এই অঞ্চলের জন্য একটি আশীর্বাদ। এখানে শহরের সমস্ত বর্জ্য এনে প্রথমে সর্টিং বা বাছাই করা হবে। বর্জ্য থেকে প্রথমেই লোহালক্কড়, প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, কাঠ এবং কাঁচের মতো অপচনশীল দ্রব্যগুলো আলাদা করা হবে। এরপর মূল পচনশীল বর্জ্য এবং শুকনো মানববর্জ্যকে বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে অত্যন্ত উন্নতমানের উর্বর কম্পোস্ট জৈব সার উৎপাদন করা হবে। অন্যদিকে, আলাদা করা অপচনশীল অংশ এবং শোধন প্রক্রিয়া থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত হবে শক্তি (জ্বালানি) ও প্রাকৃতিক গ্যাস।
প্রকল্পের এই দীর্ঘ বিলম্বের বিষয়ে মূল অবকাঠামো নির্মাণের ঠিকাদার নূরে আলম টিটুর কাছে জানতে চাইলে তিনি রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক নানাবিধ সমস্যার অজুহাত দেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু আইনি জটিলতা, স্থানীয় এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নিচু এলাকা হওয়াতে মাটি ভরাটে সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে নির্মাণ কাজ অনেকখানি পিছিয়ে গেছে। নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। আগামি দুই মাসের মধ্যে প্ল্যান্টটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। প্রকল্পের জটিলতা শুধু অবকাঠামো বর্জ্য পুড়িয়ে ধ্বংস করার মূল চালিকাশক্তি 'কমবাসশন মেশিন' আনার প্রক্রিয়াও থমকে আছে। চার কোটি দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকা ব্যয়ে এই আধুনিক মেশিন সরবরাহের জন্য ২০২৪ সালের ১২ মার্চ কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল 'লাবণী-কেএইচটি (জেভি)' নামে আরেকটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এক বছরের মধ্যে মেশিন সরবরাহের চুক্তি থাকলেও তারা নির্ধারিত সময়ে তা দিতে পারেনি।
মেশিন সরবরাহে ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করে ঠিকাদার সাদেকুল ইসলাম কাঞ্চন জানান, এই বিশেষ কমবাসশন মেশিনটি চীন (চায়না) থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। গত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে ব্যাংক এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে তীব্র বৈশ্বিকও অভ্যন্তরীণ জটিলতা ছিল। এই এলসি সমস্যার কারণেই যথাসময়ে মেশিনটি দেশে আনা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে এই জটিলতা কেটে গেছে। অলরেডি অর্ডার চূড়ান্ত করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে— আগামি দেড় মাসের মধ্যে মেশিনটি প্রকল্প এলাকায় চলে আসবে।
কালিহাতী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোশারফ হোসেন জানান, প্ল্যান্টে মানববর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য এরইমধ্যে পৌরসভার জন্য পাঁচটি ভ্যান সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বসত বাড়ি, অফিস-আদালত এবং বিভিন্ন স্থাপনার সেপটিক ট্যাংক থেকে ফিক্যাল সংগ্রহ করার জন্য একটি ভেকু ট্রাক ও অপচনশীল পণ্য পরিবহনের জন্য একটি গার্বেজ ট্রাক সরবরাহ করা হয়েছে-প্ল্যান্ট চালু না হওয়ায় গাড়িগুলো পৌরসভার গ্যারেজে রাখা হয়েছে। কালিহাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারহানা মামুন বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই কৃষিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যাপ্ত জৈব সার উৎপাদন করা গেলে কৃষকরা কম দামে তা ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর দিক থেকে পরিবেশের যেমন উন্নতি হবে তেমনি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে। কালিহাতী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী গাজিউর রহমান জানান, প্ল্যানটির নকশা ও ডিজাইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। জমি অধিগ্রহণ মাটিভরাট ও বর্ষাজনিত কারণে কাজটি শেষ করতে বিলম্ব হয়েছে। সঠিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে বর্জ্য পরিবেশের বোঝা না হয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হবে।
কালিহাতী পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা আক্তার জানান— পৌরসভাকে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি হস্তান্তরের জন্য এরইমধ্যে ঠিকাদার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নানাবিধ কারণে এটি এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্প কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুতই এটির কর্যক্রম শুরু হবে। পৌর এলাকার শতভাগ বর্জ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে এটির উৎপাদন সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে জৈব সার কৃষকের হাতে পৌঁছবে।