
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা যতই ঘনিয়ে আসছে। উৎসবের আমেজ ততই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায়। পূজার ক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা।
এবছর এ উপজেলায় ৫৫টি দুর্গাপূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ নিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা। কারও হাতে বাঁশ-কাঠের কাঠামো, কারও হাতে খড় ও মাটি; আবার কেউ ব্যস্ত প্রতিমার মুখাবয়ব, অলংকার ও সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটিয়ে তুলতে।
আজ শনিবার মহালয়ার মধ্যদিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। এরপর ১৫ অক্টোবর পঞ্চমী এবং ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ১৭ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। পূজার নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে পুরোদমে। কোথাও প্রতিমার অবয়ব নির্মাণ, কোথাও মাটির প্রলেপ শুকানো, আবার কোথাও চলছে রং ও সাজসজ্জার প্রস্তুতি। পূজার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে কারিগরদের এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। প্রতিমা তৈরির কারিগর সুফল দেব বলেন, "একটি প্রতিমা তৈরি করতে সাধারণত দেড় মাসের মতো সময় লাগে।
পূজার দিন ঘনিয়ে আসায় কাজের চাপ বেড়েছে। সময়মতো প্রতিমা সরবরাহ করতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়। তবে বৃষ্টি হলে মাটি শুকানো ও রং করার কাজে বিলম্ব হয়।
কারিগররা জানান, প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে অবয়ব তৈরি করে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে প্রতিমার মুখাবয়ব, অলংকার ও সূক্ষ্ম নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। সবশেষে রং, পোশাক, অলংকার ও বিভিন্ন সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়। এ কাজে নদী বা পুকুরের পলিমাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ, কাপড় ও রংসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। আরেক কারিগর নারায়ণ চন্দ্র বলেন, প্রতিমা তৈরি শুধু আমাদের জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি ঐতিহ্য ও শিল্পের অংশ। প্রতিটি প্রতিমার মুখাবয়ব ও নকশায় আলাদা যত্ন নিতে হয়। পূজামণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের পর দর্শনার্থীদের প্রশংসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এদিকে পূজার প্রস্তুতি ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন মণ্ডপ পরিচালনা কমিটির সদস্যরাও। প্রতিমা তৈরির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে কারিগরদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তাঁরা। কাতিহার পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিব রায় বলেন, মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতির পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করা জরুরি। এ জন্য কারিগরদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কারিগররা জানান, প্রতিমার আকার, নকশা ও সাজসজ্জার ওপর নির্ভর করে তৈরির খরচ। বড় প্রতিমা তৈরিতে তুলনামূলক বেশি সময়, শ্রমিক ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া বাঁশ, খড়, মাটি, রং ও অলংকার তৈরির উপকরণের দাম বাড়ায় প্রতিমা নির্মাণের খরচও বেড়েছে। কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় মাটির প্রতিমাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও ভিড় করছেন মণ্ডপ ও কারখানায়। শিল্পীদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হবে এবং তাঁদের শিল্পকর্মে পূজার উৎসব আরও বর্ণিল হয়ে উঠবে।
রাণীশংকৈল থানার ওসি আমানুল্লাহ আল বারী জানান, এবছর রাণীশংকৈল উপজেলায় ৫৫টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। আমরা প্রতিটি পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেছি। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা দেখা যায়নি। এ ছাড়া প্রতিটি পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সভা করা হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।