
একটি বিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরে নির্মিত কোনো স্থাপনা বা ভবন নয়; এটি একটি অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান কেন্দ্র। শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেওয়া হয় না, সেখানে একজন শিক্ষার্থীকে আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপদ ও উপযুক্ত ভৌত পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শ্রেণিকক্ষই যদি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে, শিক্ষার্থীদের যদি ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর নিচে বসে পাঠ গ্রহণ করতে হয়, তবে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। জামালপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল মেলান্দহ উপজেলার ৩ নম্বর মাহমুদপুর ইউনিয়নের নলছিয়া গ্রামের রহিমা জলিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় আজ এমনই এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালাতে ১৯৯৯ সালে পশ্চিম জামালপুরের একজন দানবীর, শিক্ষানুরাগী, জনহিতৈষ ও সমাজ সংস্কারক আলহাজ আব্দুল জলিল জান মাস্টার তাঁর সহধর্মিণী রহিমা বেগম ও নিজের নামের সমন্বয়ে নামকরণ করে রহিমা জলিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বন্যাকবলিত চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং একটি সুশিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলার মহৎ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। নানান চড়াই-উতরাই পার করে দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিদ্যালয়টি সেই দায়িত্ববোধ থেকে নিরলসভাবে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সন্তোষজনক ফলাফল অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সাল থেকে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। বিভিন্ন সময়ে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি উপজেলা ও জেলা পর্যায়েও কৃতিত্ব দেখিয়েছে। অর্থাৎ, অবকাঠামোগত চরম সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতা এবং মেধার কোনো ঘাটতি নেই। নেই কোনো জায়গার সংকীর্ণতা। তবুও বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রতিষ্ঠাকালে এ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ আব্দুল জলিল জান মাষ্টার সাহেবের দান করা ৮১ শতাংশ জমিতে এককালীন ১০ লাখ টাকার অনুদানের অর্থে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য দুটি কাঁচা ও টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল।
সময়ের ব্যবধানে সেই স্থাপনাগুলো এখন জরাজীর্ণ ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের বয়স প্রায় তিন দশক হতে চললেও সেখানে আজ পর্যন্ত একটি আধুনিক ও স্থায়ী একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এটি শুধু একটি ভবনের সংকট নয়, এটি সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশের সংকট। একজন শিক্ষককে যখন সীমিত ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে হয়, তখন তার স্বাভাবিক মনোযোগ ব্যাহত হয়। একইভাবে শিক্ষার্থীরা যখন পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাহীন পরিবেশে পড়াশোনা করে, তখন তাদের শিখন প্রক্রিয়া ও মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা যখন শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে বড় বড় কথা বলি, তখন শুধু পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকালে চলবে না। নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাসকেও মানসম্মত শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। শহরের অনেক বিদ্যালয় যেখানে আধুনিক ভবন ও প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ পাচ্ছে, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সফল বিদ্যালয় কেনো এখনও একটি নিরাপদ একাডেমিক ভবনের অপেক্ষায় থাকবে? গ্রামের শিক্ষার্থীরাও দেশের ভবিষ্যৎ সুনাগরিক হওয়ার অপেক্ষায়। তাদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ পাওয়ার অধিকার কোনো অংশেই কম নয়।
দেশের সুষম উন্নয়নের স্বার্থেই শিক্ষা ক্ষেত্রের এই গ্রামীণ ও নগর বৈষম্য দূর করতে হবে। রহিমা জলিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি— এখানে দ্রুত একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হোক। এই দাবিকে নিছক স্থানীয় কোনো চাওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দাবি। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের দ্রুত দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি অর্থায়নে একটি স্থায়ী একাডেমিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
যে বিদ্যালয়টি আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে নলছিয়া ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে, তাকে এভাবে অবহেলায় ফেলে রাখা যায় না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রচেষ্টা যখন ফলাফলে প্রতিফলিত হচ্ছে, তখন তাদের প্রয়োজনীয় ভৌত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। রহিমা জলিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ ঘর নয়, একটি নিরাপদ ও আধুনিক শিক্ষাঙ্গন পাওয়ার অধিকার রাখে। এখন সময় শুধু আশ্বাসের নয়, দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণের।