ঢাকা সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বিশ্ব ব্রেইল দিবস : অন্ধকারে শিক্ষার আলোকবর্তিকা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
বিশ্ব ব্রেইল দিবস : অন্ধকারে শিক্ষার আলোকবর্তিকা

মানব জীবনে দৃষ্টি হারানো মানেই শিক্ষা, মর্যাদা বা স্বাবলম্বিতা হারানো নয়। এমন উদাহরণ অনন্য: ব্রেইল পদ্ধতি। এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শুধু একটি লেখার পদ্ধতি নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক সংযোগের প্রতীক। প্রতি বছর ৪ জানুয়ারি বিশ্ব ব্রেইল দিবস উদযাপন করা হয়। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিগত সমাধান এবং অধিকার নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্ব।

ব্রেইল : দৃষ্টিহীন জীবনের শিক্ষার ভিত্তি: ব্রেইল হলো একটি বিশেষ পাঠ ও লেখন পদ্ধতি, যেখানে ছয়টি উঁচু বিন্দুর মাধ্যমে অক্ষর, সংখ্যা এবং চিহ্ন প্রকাশ করা হয়। আঙুলের স্পর্শে এই বিন্দুগুলো অনুভব করে দৃষ্টিহীন মানুষ পড়তে শেখে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি শিক্ষার মাধ্যম হলেও, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কাছে ব্রেইল মানে আত্মবিশ্বাস, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংযোগ। লুই ব্রেইল ১৮০৯ সালের ৪ জানুয়ারি ফ্রান্সের কুপভেরি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র তিন বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারালেও তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে পরাজিত করে শিক্ষার নতুন পথ উদ্ভাবন করেন। তার জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে জাতিসংঘ ৪ জানুয়ারি বিশ্ব ব্রেইল দিবস ঘোষণা করেছে।

ব্রেইলের উদ্ভাবন ও ইতিহাস : উনিশ শতকের শুরুর দিকে ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা চার্লস বারবিয়ের ‘নাইট রাইটিং’ পদ্ধতি (১২ বিন্দু) উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি সেনাদের জন্য কার্যকর হলেও দৃষ্টিহীনদের জন্য জটিল ছিল। মাত্র ১২ বছর বয়সে লুই ব্রেইল এটি সহজ করে দুই কলাম ও তিন সারির ছয় বিন্দুর কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করেন। এই সেল বিন্যাসই আধুনিক ব্রেইলের ভিত্তি। ব্রেইল কেবল বর্ণমালা নয়; এটি গণিত, সংগীত, বিজ্ঞান এবং বিভিন্ন ভাষার জন্যও ব্যবহারযোগ্য। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রেইল শিশুর বোধগম্যতা ও চিন্তাশক্তি উন্নত করতে সহায়ক। এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সংযোগের সুযোগও নিশ্চিত করে।

ব্রেইল পড়া ও লেখার প্রক্রিয়া : ব্রেইল সাধারণত মোটা কাগজে উঁচু বিন্দু তৈরি করে লেখা হয়। আঙুলের স্পর্শে বিন্দুগুলো অনুভব করে পাঠ করা হয়। শব্দ, বাক্য এবং ফাঁকের নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। প্রথাগত পদ্ধতিতে ব্রেইল রাইটার ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রিন্টের মত স্পষ্ট বিন্দু তৈরি হয়।আধুনিক প্রযুক্তিতে রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লে ডিজিটাল লেখাকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্রেইলে রূপান্তর করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বাতাসচালিত ‘হলি ব্রেইল’ ট্যাবলেট নিয়ে কাজ করছেন। সফল হলে এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষার নতুন যুগ সূচিত করবে। বর্তমান প্রযুক্তি যদিও ব্যয়বহুল, তবু শিক্ষায় এর সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী শিক্ষিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা অনলাইন কোর্স, ডিজিটাল গ্রন্থাগার এবং অডিওবুক ব্যবহার করে দ্রুত দক্ষতা বাড়াচ্ছেন। এভাবে ব্রেইল শুধু শিক্ষার মাধ্যম নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে স্বাবলম্বিতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

প্রযুক্তি ও ব্রেইলের গুরুত্ব : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অন্ধ। অডিও প্রযুক্তি জনপ্রিয় হলেও স্থায়ী শিক্ষা, সাক্ষরতা এবং আত্মনির্ভরতার ক্ষেত্রে ব্রেইলের বিকল্প নেই। এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষার স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করে, যা তাদের আত্মনির্ভরতা ও সমাজের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি করে।

বর্তমান সময়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা শুধু পড়াশোনার জন্য নয়, ডিজিটাল তথ্য, ব্যাংকিং, সরকারি ও ব্যক্তিগত সেবা ব্যবহারেও ব্রেইলের সাহায্যে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেন। বিভিন্ন দেশে ব্রেইল শিক্ষার মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও সমাজসেবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

ব্রেইল ব্যবহার করে অনলাইন পেমেন্ট, সরকারি সেবা, কুইজ প্রতিযোগিতা, এবং কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তথ্য সহজেই গ্রহণ করা সম্ভব। ব্রেইল প্রযুক্তি শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে, যা একটি মানবিক সমাজের জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা : একসময় অন্ধত্বের হার ছিল ১.৪৫ শতাংশ, বর্তমানে কমে ০.৬৯ শতাংশ। আনুমানিক ১২ লাখ মানুষ অন্ধ, ৫১ লাখ মানুষ ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যায় ভুগছে।

প্রধান দৃষ্টিজনিত সমস্যা : ছানি, গ্লুকোমা ও রেটিনার রোগ, ছানি: ৪-৫ শতাংশ (৮৫ লাখ), গ্লুকোমা: ১-২ শতাংশ (৩৪ লাখ)।

চশমাজনিত সমস্যা : প্রায় ১০ শতাংশ (১ কোটি ৭০ লাখ) পরিসংখ্যান দেখায় চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষা, সহায়ক প্রযুক্তি, সচেতনতা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়, এনজিও এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্রেইল শিক্ষাকে প্রসারিত করতে কাজ করছে, যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

অধিকার ও সমান সুযোগ : জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’ অনুযায়ী তথ্য ও প্রযুক্তিতে সমান প্রবেশাধিকার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মৌলিক অধিকার। দেশে প্রায় ২৪ হাজার ওয়েবসাইট থাকলেও একটিও পুরোপুরি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। এটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই শিক্ষার সমান সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং সেবা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্রেইল সফটওয়্যার, মোবাইল অ্যাপস ও অনলাইন গ্রন্থাগার তৈরি করছে। সরকারি স্কুলগুলিতে ব্রেইল শিক্ষক নিয়োগ এবং সহায়ক প্রযুক্তি সরবরাহ বৃদ্ধি করা হলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।

বিশ্ব ব্রেইল দিবস : শিক্ষা, সচেতনতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়: বিশ্ব ব্রেইল দিবস কেবল একটি উদযাপন নয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য প্রযুক্তি, শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক সহায়তা অপরিহার্য। ব্রেইল তাদের জীবনে আলো নিয়ে আসে, আত্মমর্যাদা নিশ্চিত করে এবং সমাজে সংযোগ স্থাপন করে।

বাংলাদেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষার প্রসার, সহায়ক প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন ব্রেইল রিসোর্স, সহায়ক পাঠ্যসূচি এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করা সম্ভব। পরিশেষে বলতে চাই, ব্রেইল শুধু একটি পড়ার পদ্ধতি নয়। এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সামাজিক সংযোগ ও স্বাভাবিক জীবনের সেতুবন্ধন। বিশ্ব ব্রেইল দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও শিক্ষাই মানবিক সমাজের পরিচয়।

ব্রেইল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দৃষ্টিহীনতা মানে অন্ধকার নয়। শিক্ষা, সচেতনতা ও প্রযুক্তি প্রতিটি মানুষের জন্য আলোর পথ তৈরি করে। আমাদের দায়িত্ব হলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জীবনে সেই আলো পৌঁছে দেওয়া।

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

কলাম লেখক ও প্রাবন্ধকার

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত