ঢাকা সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

যুবসমাজ ও মাদকের নীল দংশন : একটি সামাজিক মহাবিপর্যয়

যুবসমাজ ও মাদকের নীল দংশন : একটি সামাজিক মহাবিপর্যয়

একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ। যে দেশের তরুণরা যত বেশি সৃজনশীল, সাহসী এবং কর্মঠ, সে দেশের ভবিষ্যৎ তত বেশি উজ্জ্বল। কিন্তু বর্তমানে আমাদের এই সম্ভাবনাময় যুবসমাজের সামনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। মাদকের মরণনেশা আজ কুরে কুরে খাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মেধা, প্রাণশক্তি এবং নৈতিকতা।

মাদকের মরণফাঁদ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট : আজকাল পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবখানেই মাদকের সহজলভ্যতা এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৌতূহল, সঙ্গদোষ, একঘেয়েমি কিংবা স্রেফ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে একজন তরুণ প্রথম মাদক গ্রহণ করে। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই সাময়িক আনন্দ পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী বিষাদে। ইয়াবা, ফেন্সিডিল, আইস, এলএসডি বা হেরোইনের মতো মরণঘাতী ড্রাগগুলো আজ তরুণদের হাতের নাগালে। এর ফলে ধ্বংস হচ্ছে একটি প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা।

শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয় : মাদকের প্রভাব শুধু নেশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া তৈরি করে।

শারীরিক ক্ষতি : লিভার সিরোসিস, ফুসফুসের ক্যান্সার, কিডনি অকেজো হওয়া এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

মানসিক ক্ষতি : মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিষণ্ণতা, সিজোফ্রেনিয়া এবং প্রচণ্ড হীনম্মন্যতায় ভোগে। তাদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ এবং উগ্রতা তৈরি হয়, যা অনেক সময় আত্মহত্যার পথেও ঠেলে দেয়।

সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয় : একটি পরিবারে যখন একজন তরুণ মাদকাসক্ত হয়, তখন পুরো পরিবারটি নরকে পরিণত হয়। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ওই তরুণ চুরি, ছিনতাই এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ঘরে মা-বাবার অবাধ্য হওয়া থেকে শুরু করে পারিবারিক কলহ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। মাদকাসক্তির কারণেই আজ সমাজে কিশোর গ্যাং কালচার, ধর্ষণ এবং খুনের মতো জঘন্য অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

কেন তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে?

এর পেছনে বেশ কিছু সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে-

বেকারত্ব ও হতাশা : কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা সৃষ্টি করে, যা থেকে মুক্তি পেতে অনেকে মাদকের আশ্রয় নেয়।

পারিবারিক বিচ্ছেদ ও অযত্ন : বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব বা সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া অনেক সময় তাদের বিপথে চালিত করে।

অপসংস্কৃতির প্রভাব : সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে মাদক গ্রহণকে অনেক সময় আভিজাত্য বা ‘কুল’ হিসেবে দেখানো হয়, যা তরুণদের প্রলুব্ধ করে।

উত্তরণের উপায় : আমাদের করণীয়-

মাদকের এই ভয়াল গ্রাস থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু প্রশাসনের কাজ নয়, বরং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

পারিবারিক সচেতনতা : সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।

ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা : ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।

সুযোগ সৃষ্টি : তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। লাইব্রেরি ও খেলার মাঠের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা : মাদক সিন্ডিকেট নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। মাদকের উৎস বন্ধ করা এবং পাচারকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

যুবসমাজ যদি মাদকের নীল দংশনে নীল হয়ে যায়, তবে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়বে। তরুণদের বুঝতে হবে, মাদক মুক্তি নয়, বরং এটি একটি অন্ধকার গহ্বর। একটি সুন্দর, সুস্থ এবং সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে আমাদের এখনই সমস্বরে বলতে হবে, ‘মাদককে না বলুন, জীবনকে ভালোবাসুন।’ আসুন, আমরা সবাই মিলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার শপথ নিই।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত