প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬
কাকডাকা ভোরে একরাশ স্বপ্ন আর হাতে ভারি ব্যাগ নিয়ে যখন ঢাকায় পা রেখেছিলাম, তখন এই শহরটাকে মনে হয়েছিল শুধু এক যান্ত্রিক গোলকধাঁধা। জীবনের কঠিন প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ার তীব্র বাসনা আর নতুন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অচেনা পরিবেশের হাতছানি সব মিলিয়ে মনে এক মিশ্র অনুভূতি ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই অচেনা শহর আর মানুষগুলো আজ আমার চিরপরিচিত, যেন কতো জনমের চেনা! ঢাকায় আসার পর থেকেই মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতো- এই যান্ত্রিক শহরের ওপর কেন এত দ্রুত একটা অদ্ভুত মায়া পড়ে গেল? আমার স্বাধীনতা, নাকি মাথার ওপর নতুন এক ছাদ পাওয়ার আনন্দ? উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে বারবার থমকে গেছি। অবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তরটা যখন মিলল, তখন দেখলাম সেই উত্তরের নাম আমার ‘ডিপার্টমেন্টের বন্ধুগুলো’। ঢাকার জ্যাম, ধুলোবালি আর ব্যস্ততাকে ছাপিয়ে এই শহরটা আমার কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে শুধু কিছু মানুষের জন্য। প্রথম দিনেই পাওয়া সেই মুখগুলো, যাদের সঙ্গে এখন প্রতিনিয়ত চলে খুনশুটি, আড্ডা আর অন্তহীন খেলা।
একসঙ্গে শহিদ মিনারের বেদিতে বসে গিটারের সুরে বা খালি গলায় গান গাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো যদি না থাকত, তবে কি এই ঢাকা আমার কাছে এতটা মায়াবী হতো? উত্তরটা খুব স্পষ্ট কখনই না। মানুষের ভিড়ে ঢাকা হয়তো হারিয়ে যেত, যদি না সেখানে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে কেক মাখামাখির উৎসব হতো কিংবা জন্মদিনে সামান্য কিছু নিয়ে মেতে ওঠার আনন্দ থাকত।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধু আনন্দ নয়, আমাদের মধ্যকার মান-অভিমান আর ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির ঝগড়াগুলোই এই শহরটাকে আরও আপন করে তুলেছে। ঝগড়া শেষে আবার সেই একই চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া কিংবা ক্লাসের ফাঁকে আড্ডায় মেতে ওঠা, এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই ঢাকার প্রতিটি গলিতে মায়ার আস্তর ফেলে দিয়েছে।
এখন বুঝতে পারি, ঢাকা শহর আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলেছে আমার বন্ধুরা। ঢাকার প্রতি আমার যে অদ্ভুত ভালোবাসা তৈরি হয়েছে, তার মূল কারিগর ওরাই। আজ শহরটাকে যতটা না কাছের মনে হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি আপন মনে হয় আমার এই বন্ধুদের। এই শহর এখন আর শুধু ম্যাপের কোনো বিন্দু নয়; বরং এই শহর মানেই এখন প্রিয় কিছু মানুষের হাসিমুখ।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়