প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
৩৬ জুলাইয়ের নতুন সূর্যোদয় আমাদের যে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, ১৯ মাস পর এসে সেই স্বপ্ন কি তবে শুধু এক মরীচিকা? যে রাজপথ আবু সাঈদের রক্তে ভিজেছিল, যে রাজপথে মুগ্ধ তার প্রাণ দিয়ে লিখে গিয়েছিল এক নতুন ইতিহাস, সেই একই রাজপথে যখন আবার পুলিশের লাঠির আঘাতে লুটিয়ে পড়তে হয় শান্তিকামী জনতাকে, তখন প্রশ্ন জাগে- বাংলাদেশ কি তবে পোশাক পাল্টানোর খেলায় মেতেছে মাত্র? শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের যমুনা অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা ও সেখানে পুলিশের বর্বরোচিত হামলা আমাদের এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ৫ আগস্টের আগে পুলিশের যে নগ্ন রূপ দেখে জাতি শিউরে উঠেছিল, সেই একই দানবীয় উল্লাস আমরা আবার দেখতে পেলাম। প্রশ্ন এখন একটাই- পুলিশ তুমি কার? জনগণের সেবক, নাকি চিরকালই শাসকের আজ্ঞাবহ দাস?
যমুনার সামনে যে দৃশ্য জাতি প্রত্যক্ষ অবলোকন করেছে, তা কোনো সভ্য দেশের গণতান্ত্রিক আচরণের পরিচায়ক হতে পারে না। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার কিংবা ঢাকা আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মহিউদ্দিন রনির ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তা শুধু শারীরিক আঘাত নয়, বরং তা আমাদের অর্জিত নতুন বাংলাদেশের ওপর কুঠারাঘাত।
বিশেষ করে মহিউদ্দিন রনিকে মাটিতে ফেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে যেভাবে লাঠিচার্জ করছিল, তা দেখে মনে হয়েছে তারা যেন কোনো মরণজয়ী শত্রুকে পরাস্ত করছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়া একজন নিরস্ত্র মানুষের ওপর এমন জিঘাংসা কিসের ইঙ্গিত দেয়? রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যমের ওপরও নেমে এসেছে পুলিশের অন্ধ আক্রোশ। একজন সাংবাদিককে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার যে দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা পুলিশের সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী চরিত্রের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। সাংবাদিকদের ওপর এই চড়াও হওয়া প্রমাণ করে যে, পুলিশ এখনও সত্যকে ভয় পায় এবং অন্ধকারেই তাদের স্বাচ্ছন্দ্য।
ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পুলিশ বাহিনীকে তারা ব্যবহার করেছে নিজেদের গদি রক্ষার ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে। স্লোগানে বলা হয় ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’, কিন্তু বাস্তবে পুলিশ সব সময় ক্ষমতার পেয়াদা হয়েই থেকেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশের একজন সদস্যের সেই উদ্ধত উক্তি ‘আয় হাদির লাশ নিয়ে যা’ শুধু ব্যক্তিগত অসভ্যতা নয়, এটি এই বাহিনীর গভীরে লুকায়িত পুরোনো সেই কুৎসিত মানসিকতার প্রতিফলন, যা সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করতে শেখে না।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এই পুলিশই সাভারে ছাত্র-জনতার লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো জঘন্যতম অপরাধ করেছিলল। সেই বাহিনীর সংস্কার না করে শুধু পোশাক পরিবর্তন কী জনগণের মনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে পারে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৯ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কেন এই বাহিনীকে একটি মানবিক ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করতে পারল না, তা আজ বড় প্রশ্ন। প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা এখনও সরকারকে ভুল পথে পরিচালিত করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
সামনে মাত্র ৪ দিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রাথমিক শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা। কিন্তু বর্তমানে পুলিশের যে চরিত্র উন্মোচিত হচ্ছে, তাতে জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। যে পুলিশ শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে বর্বরোচিত হামলা চালায়, সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করে, তারা নির্বাচনের দিন জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করবে- এমন বিশ্বাস স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে বিশাল দূরত্ব বা ‘গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, তা যদি দ্রুত কমিয়ে আনা না যায়, তবে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আগামী নির্বাচনে। প্রশাসন যদি সরকারের কথা না শুনে নিজের মতো অরাজকতা চালায়, তবে বুঝতে হবে ক্ষমতার কেন্দ্রে এক গভীর ফাটল ধরেছে। জনগণ এবং পুলিশের এই বৈরী সম্পর্ক দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত। পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকারের ‘জনবান্ধব’ করতে হলে শুধু বদলি বা পোশাক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আমূল কাঠামোগত সংস্কার।
বিচারের সংস্কৃতি নিশ্চিত করা : জুলাই অভ্যুত্থানে ঘাতক হিসেবে ভূমিকা রাখা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচার যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বর্তমান সদস্যরা ভাববে- অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়। তাই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ফ্যাসিবাদের দোসরদের অপসারণ : বাহিনীর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা দেশদ্রোহী ও ফ্যাসিবাদী শক্তির উচ্ছিষ্টভোগীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিদায় করতে হবে।
নতুন নিয়োগে নৈতিকতা : ভবিষ্যতে পুলিশ নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু মেধা নয়, বরং প্রার্থীর মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং নৈতিক চরিত্রের কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ : পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হিসেবে কাজ করবে না, এমন আইনি কাঠামো ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে লাঠির জোরে মুখ বন্ধ করার সংস্কৃতি কখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ৫ আগস্টের বর্ষা বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে যে, বন্দুকের নল দিয়ে জনতাকে দাবিয়ে রাখা অসম্ভব। পুলিশ যেন মনে রাখে, তারা এদেশের সন্তান এবং তাদের বেতন আসে এই সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো টাকায়। ক্ষমতার মোহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনগণের ঘৃণা চিরস্থায়ী। সময় থাকতে সংযত হওয়া এবং জনতার কাতারে ফিরে আসাই এখন পুলিশ বাহিনীর জন্য একমাত্র সম্মানজনক পথ।
আব্দুল কাদের জীবন
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়