প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ। দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের সংকোচন, একতরফা নির্বাচন এবং ক্রমাগত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল হয়ে পড়া সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে তৈরি হয়েছিল এক ধরনের চাপা অস্থিরতা। এই প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ আবার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ফিরবে এমন এক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি হবে একটি নতুন শুরুর মুহূর্ত; যেখানে অতীতের ভুল, অবিচার ও রক্তপাতের বিচার হবে এবং রাজনীতিতে আস্থার পুনর্গঠন ঘটবে।
কিন্তু সেই প্রত্যাশার ওপর ক্রমশই ঘনিয়ে আসছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতেই মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটের প্রতি সরকারের নমনীয় অবস্থান, ব্যালট জালিয়াতির আগাম আলামত এবং সর্বোপরি শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হচ্ছে। নির্বাচনের আগে যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব, সেখানে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত বছরের ২ ডিসেম্বর, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরপরই রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে মোটরসাইকেলে থাকা দুর্বৃত্তরা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। মাথা ও ডান কানের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। এই হত্যাকাণ্ড নিছক একটি ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল না; বরং এটি ছিল নির্বাচনের প্রাক্কালে সংঘটিত একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক সহিংসতা, যা জনমনে গভীর আতঙ্ক ও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে, তখন এ ধরনের হত্যাকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। প্রশ্ন ওঠে এটি কি কাউকে ভীত করার চেষ্টা? নাকি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ? হাদি হত্যাকাণ্ডের পর সরকার দ্রুত বিচার, দোষীদের গ্রেপ্তার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং হত্যাকারীরা সব আলামত থাকা সত্ত্বেও নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে যা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নতুন কিছু নয়। অতীতে বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ড বছরের পর বছর বিচারহীন রয়ে গেছে। ফলে একটি ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। হাদি হত্যাকাণ্ডও কি সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন এখন রাজপথে, সামাজিক মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক আলোচনায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা হাদি হত্যার বিচারে বদ্ধপরিকর এবং জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত পরিচালনার আইনগত দিকগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। এমনকি আজ রোববার জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থায় আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ধরনের আশ্বাস হাদি হত্যাকাণ্ডের পরপরই দেওয়া হয়েছিল। সময় গড়িয়েছে, কিন্তু বিচার এগোয়নি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এটি কি শুধু সময়ক্ষেপণের কৌশল? নাকি সরকারের ভেতরেই কোনো ধরনের অনিচ্ছা বা দ্বিধা কাজ করছে?
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের অধীনে শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চলছিল। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল গত শুক্রবারের মধ্যে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠাতে হবে। কিন্তু গতকাল এই যৌক্তিক আন্দোলনের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলা পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। পুলিশের হামলায় অন্তত ৫০ জনের বেশি আন্দোলনকারী আহত হন। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন আচরণ শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নই তোলে না, বরং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাত্র পাঁচ দিন আগে এ ধরনের দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে জনগণ যে সংযম, নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশা করে, এই হামলা তার সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা দেয়। হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সরকারের টালবাহানা কেন? এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে কি না এ প্রশ্ন এখন আর গোপন নেই। কেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহিংসতায় জড়াল পুলিশ? কেন শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতেই হবে। কারণ একটি নির্বাচন শুধু ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার নাম নয়; এটি জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন মানুষ দেখে, একটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না, বরং বিচার চাইতে গিয়ে নাগরিকরা পুলিশি হামলার শিকার হন তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, হাদি হত্যাকাণ্ড এবং এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া সেই প্রত্যাশাকে গুরুতরভাবে কলুষিত করেছে। নির্বাচনের পরিবেশ তখনই সুষ্ঠু হয়, যখন সব রাজনৈতিক পক্ষ নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিশ্চয়তা কোথায়? আন্দোলনকারীরা যদি রাজপথ ছাড়তে বাধ্য না হন, আর সরকার যদি বলপ্রয়োগের পথেই হাঁটে, তাহলে নির্বাচনের দিন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে শুধু একটি নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, বরং দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা আবারও পিছিয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব হলো পরিস্থিতি শান্ত করা এবং আস্থা পুনর্গঠন করা। তার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ অনিবার্য।
প্রথমত, হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর উদ্যোগ ও সময়সীমা ঘোষণা জরুরি। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তৃতীয়ত, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের পথ খুলতে হবে। চতুর্থত, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে। অন্যথায়, এই নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে, যার ফলাফল জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে। হাদি হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই হত্যার বিচার না হলে তা একটি ভয়ংকর নজির স্থাপন করবে যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা নির্বিঘ্নে ঘটে, কিন্তু ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যায়। আর এমন রাষ্ট্রে নির্বাচন যতই আয়োজন করা হোক না কেন, গণতন্ত্র সেখানে অনিশ্চয়তার মধ্যেই বন্দি থাকবে। এই সংকটময় মুহূর্তে সরকার যদি দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দেয়, তাহলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে শুধু একটি ব্যর্থ নির্বাচনের জন্য নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রতি আরেকটি বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়