প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা একদিকে বাড়ছে। অন্যদিকে এর চিকিৎসাতেও অগ্রগতি হচ্ছে প্রশংসনীয় গতিতে। কিন্তু তবুও রোগটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা হয়েই রয়েছে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, আর মারা যাচ্ছেন ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি রোগী। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিশেষজ্ঞ অনকোলজিস্ট ও নীতিনির্ধারকদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রমাণ করে- ক্যান্সার মোকাবিলা শুধু ওষুধের বিষয় নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত থেকে স্পষ্ট- ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো।
দেশে রেডিওথেরাপি মেশিনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি অপ্রতুল, দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে এবং ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, দেশব্যাপী স্ক্রিনিং সেন্টার স্থাপন, ওষুধের ভ্যাট ও শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি। ক্যানসার চিকিৎসায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম অ্যাপ্রোচ বা টিউমার বোর্ড। একজন ক্যান্সার রোগীর সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি- এই ত্রিমুখী চিকিৎসার সমন্বয় ছাড়া সঠিক ফলাফল পাওয়া কঠিন। একইসঙ্গে দক্ষ জনবল ও বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। ওষুধ কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের একটি অংশ গবেষণায় বিনিয়োগ করা হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে প্রয়োজন আর্থিক সুরক্ষা ও মানবিক সংহতি। ব্যয়বহুল ক্যান্সার চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসাবে রাষ্ট্রের উচিত ক্যান্সার রোগীদের জন্য বিশেষ ইন্স্যুরেন্স বা ‘ক্যান্সার ফান্ড’ গঠন করা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তা বৃদ্ধি এবং ওষুধের মূল্য সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা গেলে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।
ক্যান্সারকে হারানো সম্ভব, যদি আমরা সময়মতো সচেতন হই এবং সম্মিলিতভাবে লড়াই করি। নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধ শিল্প-সবার সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে ক্যান্সারের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে।
আজ যারা ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছেন এবং যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাদের সাহসের প্রতি সম্মান জানিয়েই আমাদের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে।