ঢাকা শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পবিত্র রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি

পবিত্র রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি

পবিত্র রমজান মাস সমাগত। সংযম, আত্মশুদ্ধি এবং ভ্রাতৃত্বের এই মাসটি যখন দ্বারে কড়া নাড়ছে, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে বিরাজ করছে এক প্রচ্ছন্ন আতঙ্ক- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। প্রতি বছরই রমজান আসার আগে এবং রমজান চলাকালীন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার এক অশুভ সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস রোধ করতে রমজানে পণ্যমূল্য নির্ধারণ এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও এবং অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কেন রমজানে দাম বাড়ে, তা একটি বড় প্রশ্ন। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে অসাধু ব্যবসায়ীদের ‘কার্টেল’ বা সিন্ডিকেট। এরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দেয়, ফলে হু-হু করে দাম বাড়তে থাকে। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হয়; কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আগেই স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব পড়ে যায়, অথচ দাম কমলে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। এই অসম প্রতিযোগিতা ও মুনাফালোভী মানসিকতা ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থি। যেখানে রমজান হওয়ার কথা ছিল সহমর্মিতার মাস, সেখানে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অতি-মুনাফা লাভের হাতিয়ার।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দাম বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করার কথা থাকলেও, বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা এখনও সম্পূর্ণ শৃঙ্খলিত নয়। এখানে বিক্রেতাদের একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে সরকারি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত। পণ্যমূল্য নির্ধারিত না থাকলে এবং তা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বহু পরিবারের পক্ষে ন্যূনতম ইফতার বা সাহরির আয়োজন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকার যখন প্রতিটি স্তরে (আমদানি, পাইকারি ও খুচরা) যুক্তিসঙ্গত মুনাফা রেখে দাম নির্ধারণ করে দেবে, তখন বাজারে অরাজকতা কমবে। সাধারণ ক্রেতারা জানবেন যে তারা সঠিক দামে পণ্য কিনছেন, যা জনমনে সরকারের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করে।

বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, সরকার কিছু পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। শুধু কাগজ-কলমে দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, বরং এর কঠোর বাস্তবায়নে কিছু পদক্ষেপ জরুরি। রমজানজুড়ে নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (জরিমানা ও জেল) নিশ্চিত করতে হবে। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা অপরিহার্য। নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য টিসিবির মাধ্যমে সুলভমূল্যে পণ্য বিক্রির আওতা গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। বিভিন্ন বাজার কমিটির নেতাদের সাথে বসে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যারা অসাধু উপায় অবলম্বন করবে, তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

রমজান মাসে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই নিত্যপণ্যের দাম কমানো হয় বা বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে চিত্রটি ঠিক উল্টো। ব্যবসায়ীদের মনে রাখা উচিত, সংযমের এই মাসে সাধারণ মানুষকে কষ্টে ফেলে অর্জিত মুনাফা কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না। ভোক্তা সাধারণকেও সচেতন হতে হবে। রমজান শুরুর আগেই আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুদ করার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে, কারণ এই ‘প্যানিক বায়িং’ সিন্ডিকেটকে উস্কানি দেয়।

রমজানে পণ্যমূল্য সহনীয় রাখা কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্য নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সাধারণ মানুষের অধিকার। অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কাছে সাধারণ মানুষ যেন জিম্মি না হয়ে পড়ে, সেদিকে সরকারকে সর্বোচ্চ দৃষ্টি দিতে হবে। শুধু হম্বিতম্বি নয়, বরং কার্যকর আইন প্রয়োগ ও তদারকির মাধ্যমে বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে। সরকার, ব্যবসায়ী এবং সচেতন নাগরিক- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারের রমজান যেন সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত