প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশগত বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে যে উপাদানটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত, তার নাম পলিথিন। আধুনিক সভ্যতার অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত এই প্লাস্টিকজাত পণ্যটি আজ পৃথিবীর মাটি, পানি ও বায়ুমণ্ডলকে এক ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও বদ্বীপ সদৃশ একটি দেশে পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় পলিথিন নিষিদ্ধ করা কিংবা এর ব্যবহার কমানোর জন্য কঠোর আইন ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ে না। এর মূল কারণ হচ্ছে বিকল্পের অভাব এবং সহজলভ্যতা। পলিথিন আজ মানুষের হাতের নাগালে এতটাই সহজলভ্য যে, মানুষ এর ক্ষতিকর দিক জেনেও এটি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প—পাট। পাটের বহুমুখী ব্যবহার এবং একে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় করার মাধ্যমেই কেবল এই মরণঘাতী সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
পলিথিন কেন আজ এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম, তা বুঝতে আমাদের এর রাসায়নিক গঠন ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের দিকে তাকাতে হবে। পলিথিন শত শত বছরেও মাটিতে মিশে যায় না। এটি মাটির উর্বরতা নষ্ট করে, ভূগর্ভস্থ পানির চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতে যে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা আমরা দেখি, তার প্রধান কারণ নালা-নর্দমায় জমে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। পলিথিন পোড়ানো হলে যে বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি হয়, তা ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ এসব ক্ষতির কথা জানে না এমন নয়; বরং এ দেশের সচেতন ও সাধারণ উভয় শ্রেণির মানুষই পলিথিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। তবুও কেন এর ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না? উত্তরটি খুবই সাধারণ—বিকল্পের দুষ্প্রাপ্যতা। বাজারে গেলে একজন ক্রেতা যখন কোনো পণ্য কেনেন, তখন তাকে বহন করার জন্য বিক্রেতা অনায়াসেই একটি পলিথিন ব্যাগ ধরিয়ে দেন। কিন্তু সেই একই বাজারে যদি পাটের ব্যাগ একইভাবে সহজলভ্য হতো, তবে পলিথিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই ফুরিয়ে যেত।
পলিথিন বন্ধের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পাটের ব্যাগের অভাব। বর্তমান বাজারে পলিথিন যেভাবে অহরহ পাওয়া যায়, পাটের ব্যাগ সেভাবে পাওয়া যায় না। মানুষকে কেবল সচেতন করে বা আইন দেখিয়ে পলিথিনমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব নয়, যদি না তাদের হাতে সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প তুলে দেওয়া যায়। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ যদি বাজারের প্রতিটি দোকানে এবং মানুষের হাতের নাগালে থাকে, তবে মানুষ ধীরে ধীরে পলিথিন বর্জন করে পাটের ব্যাগে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। পাটের ব্যাগ দীর্ঘস্থায়ী, বারবার ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এটি ব্যবহারের পর ফেলে দিলেও তা মাটির সাথে মিশে গিয়ে সারে পরিণত হয়। সুতরাং পাটের ব্যাগকে কেবল একটি সৌখিন পণ্য হিসেবে দেখলে চলবে না, একে একটি অত্যাবশ্যকীয় নিত্যপণ্যে রূপান্তর করতে হবে।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচার ও প্রসারে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায়। মাঝেমধ্যে কিছু সচেতনতামূলক সভা বা সেমিনার হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ছে না। সরকারি পর্যায় থেকে পাটের ব্যাগের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এর দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য বড় ধরনের ভর্তুকি প্রয়োজন। যদি দেশের প্রতিটি হাট-বাজারে, পাড়া-মহল্লায় এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে নামমাত্র মূল্যে পাটের ব্যাগ ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে মানুষ নিজের অজান্তেই পলিথিন ছেড়ে পাটের দিকে ঝুঁকবে। যখন একজন মানুষ যেকোনো দিকে তাকালেই পাটের ব্যাগ দেখতে পাবেন এবং খুব সহজে তা সংগ্রহ করতে পারবেন, তখনই পলিথিনের একচ্ছত্র আধিপত্য শেষ হবে। এটি অনেকটা অভ্যাসের বিষয়। পলিথিন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে কারণ এটি সহজলভ্য। এখন সেই স্থানটি পাটের দখল করতে হবে।
পলিথিন বিরোধী যুদ্ধে বেসরকারি খাত ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রচারণার অংশ হিসেবে প্লাস্টিক বা পলিথিনের বদলে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে পারে। বড় বড় সুপারশপ থেকে শুরু করে ফুটপাতের বিক্রেতা পর্যন্ত সবার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পাটের ব্যাগ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্র ও শিল্পপতিদের। আমাদের দেশে এক সময় পাট ছিল ‘সোনালী আঁশ’, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করত। আজ সেই পাটকে আবার ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। পাটের ব্যাগ উৎপাদনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য একটি শক্তিশালী চেইন বা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যদি পাটের ব্যাগ উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আনা যায় এবং এর সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা যায়, তবে পলিথিন বাজার থেকে এমনিতেই বিতাড়িত হবে।
অনেকেই যুক্তি দেখান যে পলিথিনের দাম কম বলে মানুষ এটি ব্যবহার করে। কিন্তু পলিথিন ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে এবং রোগবালাই মোকাবিলায় যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার তুলনায় পাটের ব্যাগের মূল্য অতি সামান্য। সরকার যদি পলিথিন কারখানার ওপর কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি পাটের ব্যাগ তৈরিতে কাঁচামাল সরবরাহ ও কর মওকুফ সুবিধা প্রদান করে, তবে এই শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এছাড়া পাটের সোনালী আঁশ থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পলিথিনের মতো পাতলা ও পচনশীল ব্যাগ তৈরির প্রযুক্তি (যেমন সোনালি ব্যাগ) উদ্ভাবিত হয়েছে। এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়ে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
দেশের প্রতিটি প্রান্তরে পাটের ব্যাগ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে পাটের ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেয়, তবে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত বদলে যাবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কেবল ভাষণ বা লিফলেট যথেষ্ট নয়, তাদের হাতে বিকল্প পণ্যটি তুলে দেওয়াই হলো আসল কাজ। যখন পাটের ব্যাগ সব জায়গায় পাওয়া যাবে, তখন পলিথিন ব্যবহারের যে মানসিকতা বা নিরুপায় অবস্থা তা দূর হবে। মানুষ তখন বাধ্য হয়ে বা ভালোবেসেই পলিথিন ত্যাগ করবে। কারণ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি নির্মল পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিশেষে বলা যায়, পলিথিন বন্ধ করা কোনো একক ব্যক্তি বা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা। আমাদের মাটি ও পানিকে বাঁচাতে হলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের জয়গান গাইতেই হবে। পাটের ব্যাগের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাই হবে পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রথম ও প্রধান ধাপ। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে হবে আমাদের সবাইকেই। পলিথিন হোক ইতিহাস, আর পাট হোক আমাদের প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী—এই অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে গেলেই সফল হওয়া সম্ভব। পাটের সোনালী আঁশের গৌরব পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই আমরা কেবল একটি দূষণমুক্ত ও সুন্দর দেশ উপহার দিতে পারি। তাই আসুন, পলিথিনকে বিদায় জানিয়ে আজ থেকেই পাটের ব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলি এবং একটি সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণে ভূমিকা রাখি।
পলিথিন মুক্ত বাংলাদেশ গড়া শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। পরিবেশের এই নীরব ঘাতককে চিরতরে বিদায় জানাতে হলে পাটের ব্যাগকে শুধু শৌখিন পণ্য নয়, বরং পলিথিনের মতো সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের অতি প্রয়োজনীয় ও সহজলভ্য সামগ্রীতে রূপান্তর করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি পাটের ব্যাগ প্রতিটি হাট-বাজারে এবং পাড়া-মহল্লায় হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে মানুষ নিজ থেকেই ক্ষতিকর পলিথিন বর্জন করবে। সোনালি আঁশের এই পুনর্জাগরণই আমাদের আগামীর সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে পারে।
ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট