প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
শহরের ফুটপাতকে আমরা প্রায়ই দেখি এক বিশৃঙ্খল দৃশ্য হিসেবে- চলাচলে বাধা, ভিড়, দোকানের সারি, আর যানজটের চাপ। তাই নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিছুদিন ফুটপাত ফাঁকা থাকে, রাস্তা কিছুটা স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু অল্প সময় পরেই আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। শুরু হয় নতুন করে দখল, নতুন করে উচ্ছেদ। এই চক্র যেন শহরের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটি তাই খুব সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ- শুধু উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়? নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যা আমরা বারবার উপেক্ষা করি?
ফুটপাতের হকাররা কোনো বিচ্ছিন্ন বা অবৈধ জনগোষ্ঠী নয়। তাদের বড় অংশই শহরের নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কেউ গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে শহরে এসেছে, কেউ দিনমজুরি বা ছোট চাকরি হারিয়ে এই পেশায় এসেছে, আবার কেউ অল্প পুঁজিতে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। তাদের কাছে ফুটপাত শুধু একটি রাস্তার অংশ নয়- এটি জীবনের শেষ আশ্রয়। প্রতিদিন সকালে তারা মালপত্র নিয়ে বসে, দিন শেষে সামান্য লাভ নিয়ে ঘরে ফেরে। এই সামান্য আয়ের ওপরই তাদের পরিবার টিকে থাকে। তাই যখন উচ্ছেদ করা হয়, তখন শুধু দোকান উঠিয়ে দেওয়া হয় না; বরং তাদের পুরো জীবিকার ভিত্তি নড়ে যায়।
এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়- উচ্ছেদ করলে তারা যাবে কোথায়? তাদের জন্য কি বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান বা নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে? নগর প্রশাসন সাধারণত ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। আইনগতভাবে এটি সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অভিযানগুলো প্রায়ই সাময়িক সমাধান দেয়। কিছুদিন পর আবার একই অবস্থা ফিরে আসে। কারণ সমস্যার মূল জায়গা- জীবিকার সংকট অমীমাংসিত থেকে যায়।
উচ্ছেদের পর হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয় আবার পুরোনো জায়গায় ফিরে আসতে। ফলে একটি চক্র তৈরি হয়- উচ্ছেদ, পুনর্দখল, আবার উচ্ছেদ। এই চক্রে প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুনর্বাসন। উন্নত নগর ব্যবস্থাপনায় সাধারণত উচ্ছেদের পাশাপাশি বিকল্প স্থান বা হকার জোন তৈরি করা হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এই ব্যবস্থা খুবই সীমিত। কিছু জায়গায় হকার মার্কেট বা নির্দিষ্ট জোনের কথা বলা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর। অনেক হকার সেখানে জায়গা পান না, আবার যেখানে জায়গা দেওয়া হয় সেখানেও পর্যাপ্ত ক্রেতা বা সুবিধা থাকে না। ফলে তারা আবার মূল সড়ক বা ফুটপাতেই ফিরে আসে। এই অবস্থায় উচ্ছেদ কার্যত একটি সাময়িক চাপ প্রয়োগে পরিণত হয়, স্থায়ী সমাধান নয়।
হকারদের শুধু সমস্যা হিসেবে দেখা একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি। বাস্তবে তারা নগরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহরের অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ তাদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনেন। ফলে তারা একদিকে যেমন জীবিকা নির্বাহ করেন, অন্যদিকে শহরের সাধারণ মানুষের চাহিদাও পূরণ করেন। এছাড়া বড় বড় শপিং কমপ্লেক্স বা দোকানের তুলনায় ফুটপাতের বাজার অনেক বেশি সহজলভ্য। তাই হকারদের সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিলে শুধু তারা নয়, সাধারণ ক্রেতারাও প্রভাবিত হন। এখানে একটি বড় দ্বন্দ্ব তৈরি হয়- নগরের শৃঙ্খলা বনাম মানবিক জীবন। প্রশাসন চায় ফুটপাত মুক্ত, যান চলাচল স্বাভাবিক এবং শহর পরিচ্ছন্ন। অন্যদিকে হকাররা চায় বেঁচে থাকার সুযোগ। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে সমস্যার সমাধান অসম্ভব। শুধুমাত্র কঠোর আইন প্রয়োগ করলে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়, আবার শুধু সহানুভূতির ভিত্তিতে চললে নগর শৃঙ্খলা ব্যাহত হয়। হঠাৎ উচ্ছেদ হকারদের জীবনে বড় ধাক্কা আনে। একদিনে তাদের পুঁজি, মালপত্র ও আয়ের উৎস হারিয়ে যায়। অনেক সময় প্রশাসনিক অভিযান চলাকালে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও পাওয়া যায়। কিন্তু সেই ক্ষতির কোনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা সাধারণত থাকে না। এর ফলে তারা আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। অনেক পরিবার হঠাৎ আয়ের উৎস হারিয়ে দারিদ্র্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও।
এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান কখনোই একমাত্র উচ্ছেদ হতে পারে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও মানবিক নগরনীতি। প্রথমত, নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি করা জরুরি, যেখানে হকাররা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারবে। এতে রাস্তা মুক্ত থাকবে এবং তাদের জীবিকাও নিরাপদ থাকবে। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে হকারদের একটি কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে এবং নগর ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। তৃতীয়ত, উচ্ছেদের আগে অবশ্যই পুনর্বাসন পরিকল্পনা থাকতে হবে। হঠাৎ উচ্ছেদ না করে ধাপে ধাপে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করলে সামাজিক ক্ষতি কমবে। চতুর্থত, তাদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তারা শুধু ফুটপাতের উপর নির্ভরশীল না থাকে।
একটি আধুনিক শহর শুধু রাস্তা, ভবন আর অবকাঠামো দিয়ে গঠিত হয় না। সেখানে বসবাসকারী সব শ্রেণির মানুষের জন্য সুযোগ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। হকাররা এই শহরেরই অংশ। তাদের উপেক্ষা করে নগর উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই নীতিনির্ধারণে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করা সময়ের দাবি। ‘উচ্ছেদে থামে না দখল’ এই বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন সত্য দেখিয়ে দেয়। সমস্যাটি শুধু ফুটপাত দখলের নয়, বরং দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান সংকট এবং নগর ব্যবস্থাপনার অসমতার ফল। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। যেখানে থাকবে আইন, শৃঙ্খলা, উন্নয়ন পরিকল্পনা- কিন্তু একই সঙ্গে থাকবে মানবিকতা ও জীবিকার নিশ্চয়তা। না হলে ফুটপাতের এই গল্প বারবার ফিরে আসবে- উচ্ছেদ, পুনর্দখল আর অনিশ্চয়তার এক অন্তহীন চক্র হয়ে।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়