ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জ্বালানি সংকট : প্রয়োজন টেকসই সমাধান ও দূরদর্শী পরিকল্পনা

জ্বালানি সংকট : প্রয়োজন টেকসই সমাধান ও দূরদর্শী পরিকল্পনা

বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এখনই যদি একটি সুদূরপ্রসারী ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হয়, তবে জাতীয় অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

আমাদের দেশের জ্বালানি সংকট মূলত আমদানিনির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাতে হয় আমদানিকৃত এলএনজি (LNG) এবং কয়লার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই এসব জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায় কিংবা ডলারের সংকট প্রকট হয়, তখনই দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গত কয়েক দশকে প্রত্যাশিত গতি না আসা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সমুদ্রবক্ষে বিশাল গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা থাকলেও যথাযথ প্রযুক্তির অভাব এবং নীতিগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমরা নিজস্ব সম্পদ আহরণে পিছিয়ে আছি।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগছে শিল্প কারখানায়। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প মালিকরা যেমন লোকসানের মুখে পড়ছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছি। অন্যদিকে, কৃষিপ্রধান এই দেশে সেচ কাজের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের বিকল্প নেই। জ্বালানি সংকটে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি বা বিদ্যুতের ঘাটতি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন সবখানেই জ্বালানির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলছে। এই সংকট থেকে উত্তরণ কোনো সাময়িক পদক্ষেপ বা জোড়াতালি দেওয়া সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী ও টেকসই উদ্যোগ।

নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান : স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে (Offshore) গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও অন্যান্য সবুজ জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।

সিস্টেম লস ও দুর্নীতি রোধ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সিস্টেম লসের নামে যে অপচয় হয় এবং অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে যে লুণ্ঠন চলে, তা কঠোর হাতে দমন করা জরুরি।

মিতব্যয়িতা ও জনসচেতনতা: রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিলাসী আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে দোষ দিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই; বরং আমাদের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সরকার, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ নাগরিক-সবাইকে সম্মিলিতভাবে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অন্ধকারমুক্ত ও গতিশীল বাংলাদেশ উপহার দেবে। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি সময়োপযোগী জ্বালানি নীতি। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত