ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

খাদ্য ও ওষুধে সর্বগ্রাসী ভেজাল : মৃত্যুর মুখে নাগরিকের মানবাধিকার

এম সফিউল আজম চৌধুরী
খাদ্য ও ওষুধে সর্বগ্রাসী ভেজাল : মৃত্যুর মুখে নাগরিকের মানবাধিকার

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে মৌলিক অধিকারগুলোর অন্যতম হলো নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভেজাল আর নকলের এক সর্বগ্রাসী মহোৎসব চলছে। সকালের নাশতার টেবিল থেকে শুরু করে রাতের শেষ ওষুধটি পর্যন্ত কোথাও আজ বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই, কোনো পণ্যই আজ শঙ্কাযুক্ত নয়। আমরা প্রতিদিন যা খাচ্ছি, যা ব্যবহার করছি বা রোগমুক্তির আশায় যে ওষুধ সেবন করছি, তার সিংহভাগই সুকৌশলে মেশানো বিষে জর্জরিত। দেশে কঠোর আইন আছে, কাগজে-কলমে সর্বোচ্চ সাজার বিধান আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দীর্ঘ তালিকা আছে; কিন্তু নেই শুধু আইনের কার্যকর, সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রয়োগ। মাঝে মাঝে ঢাকঢোল পিটিয়ে লোক দেখানো মোবাইল কোর্ট বা ঝটিকা অভিযান চালানো হলেও, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায়, রহস্যময় কারণে মাঝ পথেই তা থমকে যায়। ফলে ভেজালকারীরা পার পেয়ে যায়, আর সাধারণ নাগরিকরা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। এটি কেবল জনস্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর চরম আঘাত এবং এক ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বাংলাদেশে ভেজাল এবং নকলের বিস্তার আজ আর কোনো সুনির্দিষ্ট পণ্য বা সীমিত বিপণন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর ব্যাপ্তি এখন বহুমুখী, প্রাতিষ্ঠানিক ও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। চাল, ডাল, তেল, মসলা থেকে শুরু করে মাছ-মাংস এবং শাকসবজি- নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার সবকিছুতেই মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক। প্রসাধনী, সাবান, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে মশার কয়েল বা ঘরোয়া পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী- সবই তৈরি হচ্ছে নামি-দামি ব্র্যান্ডের মোড়ক হুবহু নকল করে ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ শিল্প-কেমিক্যাল দিয়ে, যা ব্যবহারের ফলে মানুষের স্বাভাবিক ত্বক নষ্ট হচ্ছে এবং দেশে দেখা দিচ্ছে স্কিন ক্যান্সারের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল ব্যাধি। সবচেয়ে ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশের ওষুধ খাতে। যে ওষুধ একজন মানুষের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে জীবন বাঁচানোর কথা, সেই ওষুধই এখন মানুষের মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নকল অ্যান্টিবায়োটিক, মেয়াদোত্তীর্ণ ও দূষিত স্যালাইন, ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ কিংবা স্রেফ ময়দা আর চকপাউডার দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন জটিল ও সংবেদনশীল রোগের ট্যাবলেট। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ক্যান্সারের মতো স্পর্শকাতর রোগের নকল ওষুধ বাজারে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের এই আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় জালিয়াত চক্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীর বড় বড় ওষুধের মার্কেট পর্যন্ত তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে, যা সমগ্র দেশের জনস্বাস্থ্যকে এক অপূরণীয় ও চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এই বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ও গৃহিণীরা, যাদের প্রতিদিনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিদিনের রান্নাবান্না এবং পরিবারের সদস্যদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা একজন সচেতন গৃহিণী- যিনি পেশায় একজন আইনজীবীও বটে (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে) নিজের ঘরোয়া তিক্ত অভিজ্ঞতা ও আইনি ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন যে, একজন গৃহিণী হিসেবে প্রতিদিন সকালে যখন রান্নাঘরে যাই, তখন মনে হয় আমি আমার পরিবারের জন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার নয়, বরং ধীরে ধীরে কাজ করা কোনো বিষ তৈরি করছি। বাজার থেকে যে চাল, ডাল, সবজি বা তেল আনা হচ্ছে, তার কোনোটারই বিশুদ্ধতার ন্যূনতম গ্যারান্টি রাষ্ট্র দিতে পারছে না। নিজের সন্তান একটু অসুস্থ হলে যে ওষুধটা কিনে খাওয়াব, তা আসল নাকি নকল- সেই ভয়ে হাত কাঁপে, বুক দুরুদুরু করে। আর একজন আইনজীবী হিসেবে আমি যখন আদালতের বারান্দায় দেখি এই কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা অপরাধীদের জামিন কত সহজে ও কত দ্রুত হয়ে যাচ্ছে, তখন নিজের পেশার ওপরও এক ধরনের তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা জন্মায়। আমরা আদালতে আইনের চুলচেরা মারপ্যাঁচ দেখি, জামিনের আইনি যুক্তি দেখি, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বা মৌলিক অধিকার সেখানে উপেক্ষিত থেকে যায়। রাষ্ট্র যদি আমাদের ঘরের ভেতরের এই নিত্যদিনের আতঙ্ক দূর করতে না পারে, নাগরিকের পাতের খাবার আর মুখের ওষুধের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে এই বিচারব্যবস্থা বা রাষ্ট্রযন্ত্রের সার্থকতা কোথায়? এই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের জন্য কঠোর, দৃষ্টান্তমূলক ও সম্পূর্ণ জামিন অযোগ্য শাস্তির নজির তৈরি না করলে দেশের কোনো পরিবারই আর নিরাপদ থাকবে না।

খাদ্য ও ওষুধে এই ভয়াবহ ভেজালের মারাত্মক প্রভাব সরাসরি পড়ছে মানুষের শরীরে। দেশের একজন প্রথিতযশা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ চিকিৎসক সুরক্ষার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, আমরা এক ভয়াবহ ‘মেডিকেল সুনামি’ বা নজিরবিহীন চিকিৎসা বিপর্যয়ের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। আজ দেশের ছোট-বড় হাসপাতালগুলোতে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস এবং হৃদরোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এবং এর প্রধানতম কারণ হলো- আমরা প্রতিদিন সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে যে রাসায়নিক বিষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছি। গর্ভবতী মায়েরা যখন এই ভেজাল ও কেমিক্যালযুক্ত খাদ্য প্রতিনিয়ত গ্রহণ করেন, তখন গর্ভস্থ শিশু পুষ্টিহীনতা, বিকলাঙ্গতা বা মারাত্মক কোনো জন্মগত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্ম নেয়, যা একটি পুরো প্রজন্মের জন্য অভিশাপ। তাঁর মতে, তার চেয়েও বড় শঙ্কার ও আতঙ্কের জায়গা হলো নকল ও ভেজাল ওষুধ। একজন মুমূর্ষু রোগীকে যখন জীবন বাঁচানোর জন্য নকল বা কার্যকারিতাহীন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, তখন তার শরীর ধীরে ধীরে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, পরবর্তীতে আসল এবং ভালো মানের ওষুধ খাওয়ালেও তা শরীরে আর কোনো কাজ করে না। এটা স্রেফ ভেজাল বা বাণিজ্যিক জালিয়াতি নয়, এটি একটি পরিকল্পিত নীরব হত্যাকাণ্ড। রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি এখনই কঠোরভাবে এই সিন্ডিকেটকে গোড়া থেকে দমন না করে, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা মেধাহীন, পঙ্গু ও একটি সম্পূর্ণ অসুস্থ জাতিতে পরিণত হব, যাদের চিকিৎসা করাতেই দেশের সিংহভাগ অর্থ শেষ হয়ে যাবে। এই সর্বনাশা ও সর্বগ্রাসী সংকটের গভীরতা শুধু রাজধানী বা বড় বড় বিভাগীয় মহানগরেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশের দূরবর্তী ও প্রান্তিক অঞ্চলেও এর থাবা সমভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বান্দরবান আলীকদম প্রেসক্লাবের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমদ দেশের সীমান্ত ও পাহাড়ি অঞ্চলের এই করুণ চিত্র তুলে ধরে অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে জানান, ‘ভেজাল খাদ্য কেবল একটি সাধারণ আইনি অপরাধ নয়, এটি একটি নীরব গণহত্যা। খাবারে বাণিজ্যিক কেমিক্যাল আর মারাত্মক বিষ মিশিয়ে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক পঙ্গু ও রুগ্ণ জাতিতে পরিণত করছি। একশ্রেণীর অসাধু মানুষের অতি লোভ আর রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কারণে আজ দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে ক্যান্সার, লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু সরকারিভাবে আইন প্রয়োগের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে হবে না, এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে আমাদের সবার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামষ্টিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা বা অতিরিক্ত সুযোগ নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম ও প্রধান মৌলিক অধিকার।’ একজন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমকর্মীর এই জবানবন্দি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, দেশের দুর্গম পাহাড় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত সমতল—কোথাও আজ সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যের ন্যূনতম নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।

একই সাথে, দেশের সচেতন অর্থনৈতিক ও উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী সমাজও এই বাজার অরাজকতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং সুনির্দিষ্ট সমাধানের কথা বলছেন। সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ (ব্যাংকার ইউনিট), চট্টগ্রামের আহ্বায়ক ব্যাংকার মোহাম্মদ মেহেরাব হোসেন খান ভোজ্যতেলের মতো অতিপ্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের ভেজাল, এর বিকল্প সমাধান এবং বাজার নজরদারি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও বক্তব্য তুলে ধরে জানান, ‘ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্য অধিদপ্তরের উচিত ক্ষতিকর ও রাসায়নিকযুক্ত সয়াবিন তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে গুণগত মানসম্পন্ন সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী তেল সরকারি ভর্তুকি মূল্যে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করা। শুধু ভোজ্যতেলই নয়, বর্তমানে চাল ও মুড়িতে ইউরিয়ার-হাইড্রোস, গুঁড়ো মসলায় বিষাক্ত টেক্সটাইল রং এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ফরমালিন ও উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিকের মতো মারাত্মক রাসায়নিকের মিশ্রণ জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। এর ফলে ক্যান্সার ও কিডনি রোগের মতো ব্যয়বহুল জটিলতা প্রতিনিয়ত সমাজকে গ্রাস করছে। তাই বৃহত্তর জনস্বার্থে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেট ও ভেজাল রোধে বিএসটিআই (BSTI) ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কঠোর বাজার নজরদারি জোরদার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর আহ্বান জানাচ্ছি।’

এম সফিউল আজম চৌধুরী

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত