ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

উচ্চশিক্ষায় চ্যালেঞ্জ আবাসন সংকট

উচ্চশিক্ষায় চ্যালেঞ্জ আবাসন সংকট

একটি দেশের অপার সম্ভাবনা, মেধার লালন এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সবচেয়ে বড় সূতিকাগার হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু আমাদের দেশে বিষয়টি বিস্মৃত কি না, প্রশ্নের দাবি রাখে। গত রোববার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের শীর্ষ চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারও শিক্ষার্থীর মধ্যে এ নিয়ে নীরব ক্লান্তি ও যন্ত্রণার ছাপ। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক আবাসন সংকটের যে চিত্র, তা আমাদের শুধু উদ্বিগ্নই করেনি, বরং শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের জায়গাটিতে বড় প্রশ্নচিহ্নও এঁকে দিয়েছে। যে তরুণরা বুকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পা রাখছেন, তাদের জীবনের একটি বড় অংশ কেটে যাচ্ছে গাদাগাদি গণরুম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং এক অনিশ্চিত জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ দেওয়ার কারখানা নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠন, মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং সুস্থ শরীর ও মন নিয়ে বেড়ে ওঠার এক পবিত্র আঙিনা। অথচ দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সত্তর শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের, যেখানে ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি ছাত্রীহল। ফলে আবাসন সংকটের কারণে ছাত্রীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মেস জীবন বা যাতায়াতের কষ্ট তাদের প্রতিদিনের পড়াশোনার শক্তি ও মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। বলা বাহুল্য, আমরা যদি একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ আগামী গড়তে চাই, তবে শিক্ষার্থীদের এই মৌলিক কষ্টগুলোকে আর আড়াল করে রাখার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, হলের ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নত করা এবং সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা কোনো বিলাসী দাবি নয়, এটি শিক্ষার্থীদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিতে জীবাণুর উপস্থিতি কিংবা কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাগুলো আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, ক্যাম্পাসগুলোতে নিরাপদ পানির ফিল্টারিং ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার নিয়মিত তদারকি কতটা জরুরি। আমরা মনে করি, এই সংকট থেকে উত্তরণে ব্লেমণ্ডগেম বা পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অত্যন্ত মানবিক ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত তাদের বিদ্যমান আসন সংখ্যা ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত শিক্ষার্থী ভর্তি নীতি প্রণয়ন করা। চলমান হলগুলোর সংস্কার, ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দ এবং হলের ডাইনিংয়ে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে হলগুলোর নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে আছে, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মানবিক পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, এটি রাষ্ট্রের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসবেন, এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত