ঢাকা শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ভয়াল পরিস্থিতি : সভ্যসমাজের দায় কোথায়?

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ভয়াল পরিস্থিতি : সভ্যসমাজের দায় কোথায়?

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা আজ এক গভীর নৈতিক সংকটের মুখোমুখি। রাজধানী ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম- দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা জাতিকে আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ ও শোকাহত করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করেছে, আমাদের সমাজে শিশুরা কতটা অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা আজ শুধু সামাজিক উদ্বেগ নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা একটি সভ্যরাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও বাস্তবতা দিন দিন ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো- সব জায়গাতেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অবক্ষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিশু সুরক্ষার প্রশ্ন এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জরুরি।

১৯ মে পল্লবীর রামিসা হত্যাকাণ্ড : ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। শিশুটির নির্মম পরিণতি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

নিরাপদ শৈশবের যে স্বপ্ন ছিল, তা এই ঘটনার মাধ্যমে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সমাজে প্রশ্ন ওঠে- আমরা কি সত্যিই শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছি? এই প্রশ্নের উত্তর যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই সমাজের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়ছে।

২১ মে বাকলিয়া শিশু নির্যাতন ঘটনা : এর মাত্র দুই দিন পর, ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে স্থানীয় এক যুবকের বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, শিশুরা শুধু শহর বা গ্রাম নয়- সর্বত্রই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরিচিত পরিবেশেও তারা নিরাপদ নয়, যা সমাজের গভীর অসুস্থতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পরিবার, প্রতিবেশী এবং সামাজিক কাঠামোর ভেতরে যখন নিরাপত্তা অনুপস্থিত, তখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ধারণাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া : সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও মানসিক রোগের ঝুঁকি। আর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও জীবনে জটিলতা সৃষ্টি অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হয়। একটি নির্যাতিত শিশু শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে আজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা পুরো সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধ বাড়াচ্ছে : শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ বিচারহীনতা। বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্তে গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়া এবং দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের শাস্তি এড়িয়ে যেতে সহায়তা করে। ফলে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়ে- অপরাধ করলেও পার পাওয়া সম্ভব। এই অবস্থায় অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে এবং নতুন অপরাধ সংঘটিত হয়। বিচারহীনতা শুধু আইনের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাও ধ্বংস করে দেয়।

নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে অমানবিক করছে : পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার চর্চা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভোগবাদী সংস্কৃতি, সহিংস বিনোদন এবং মূল্যবোধের শূন্যতা মানুষের আচরণকে নিষ্ঠুর করে তুলছে। ফলে সমাজে সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস কমে গিয়ে এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও বিকৃত মানসিকতা : ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ায় অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট তরুণদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে অনেকেই ধীরে ধীরে বিকৃত চিন্তা ও আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতার উৎসে পরিণত হয়েছে।

পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি : বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক অভিভাবক সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ফলে অনেক শিশু একা থাকে বা অনিরাপদ পরিবেশে বড় হয়। শিশুদের মানসিক পরিবর্তন, আচরণগত সমস্যা বা নির্যাতনের লক্ষণ অনেক সময় পরিবারের চোখ এড়িয়ে যায়। এই নজরদারির ঘাটতি অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। পরিবার যখন দুর্বল হয়, তখন শিশুর নিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

মাদক ও অপরাধপ্রবণতার প্রভাব : মাদকাসক্তি মানুষের বিবেক, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতা ধ্বংস করে দেয়। অনেক যৌন সহিংসতার ঘটনায় মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।সমাজে মাদকের বিস্তার যত বাড়ছে, সহিংস অপরাধও তত বাড়ছে। এটি শিশু নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হতে পারে।

দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি : শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্ত ও বিচার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা কমবে না। রাষ্ট্রকে কঠোর বার্তা দিতে হবে- শিশুর প্রতি সহিংসতার কোনো ক্ষমা নেই। বিচারব্যবস্থার দ্রুততা ও স্বচ্ছতা সমাজে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং অপরাধ হ্রাস করতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি : তদন্তে গাফিলতি, প্রভাব খাটানো বা অবহেলা বন্ধ করতে হবে। শিশু নির্যাতনের মামলায় বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা নিয়োগ জরুরি। ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় মানবিকতা, গোপনীয়তা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অপরিহার্য।

অনলাইন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ : অশ্লীল ও বিকৃত কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতন করতে হবে। প্রযুক্তিকে ধ্বংসের হাতিয়ার নয়, বরং শিক্ষার ও উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব : শিশুদের ‘ভালো স্পর্শ’ ও ‘খারাপ স্পর্শ’ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। সন্দেহজনক আচরণ দ্রুত গুরুত্ব দেওয়া। শিশুদের একা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে না রাখা। শিশুর মানসিক অবস্থার প্রতি সচেতন থাকা। এই সচেতনতা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে, কারণ পরিবারই প্রথম নিরাপত্তা বলয়।

নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা জোরদার : পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, চরিত্র গঠনের শিক্ষাও সমানভাবে জরুরি। একটি নৈতিক সমাজ গঠনের জন্য মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা অপরিহার্য, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে এবং অপরাধপ্রবণতা কমাতে সাহায্য করে।

প্রতিবেশী ও সামাজিক সচেতনতা : সন্দেহজনক আচরণ দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। সমাজে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে। শুধু আইন নয়, সামাজিক অংশগ্রহণই শিশু নিরাপত্তার প্রকৃত ভিত্তি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা : স্কুল ও মাদ্রাসায় শিশুসুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়মিত কাউন্সেলিং, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ পরিবেশে পরিণত করতে না পারলে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ : শিশু নির্যাতনের ঘটনা দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরতে হবে। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক আন্দোলন এবং জনমত গঠনে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে বলতে চাই, শিশুরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ। ১৯ মে পল্লবীর রামিসা আক্তার এবং ২১ মে বাকলিয়ার চার বছরের শিশুর ঘটনা শুধু দুটি নাম নয়; এটি পুরো জাতির বিবেকের প্রতিচ্ছবি। শুধু শোক বা ক্ষোভ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর বিচার, সামাজিক প্রতিরোধ, নৈতিক জাগরণ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজ- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা এখন আর বিকল্প নয়; এটি আমাদের মানবিক অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত