প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ মে, ২০২৬
মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসগুলো গড়ে তোলে খাদ্য, পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে। এক মুঠো ভাত, এক কাপ চা কিংবা শিশুর দুধে মেশানো সামান্য চিনি এসবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও জীবনের স্বাভাবিকতা। কিন্তু যখন সেই সাধারণ চিনিও হয়ে ওঠে প্রতারণার হাতিয়ার, তখন বিষয়টি আর কেবল খাদ্যে ভেজালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরিণত হয় মানবতা, নৈতিকতা ও সামাজিক বিবেকের গভীর সংকটে। আজ বাজারে ‘আখের লাল চিনি’ নামে যে ভয়ংকর ভেজাল ও প্রতারণার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তা আমাদের শুধু আতঙ্কিতই করে না, বরং একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় অতিরিক্ত মুনাফার লোভে একশ্রেণির অসাধু মানুষ ধীরে ধীরে একটি জাতির স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ ও বিশ্বাসকে বিষিয়ে তুলছে। এই প্রতিবেদন শুধু চিনির ভেজাল নিয়ে নয়; এটি আমাদের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যসচেতনতা, নৈতিক অবক্ষয়, রাষ্ট্রীয় নজরদারির দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের অসহায় বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন উঠে এসেছে চিনির ইতিহাস, পুষ্টিগুণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, তেমনি উঠে এসেছে মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম ব্যবসার অন্ধকার দিকও। তাই এই আলোচনা শুধু তথ্যভিত্তিক নয়; এটি প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি অভিভাবক এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের জন্য এক সতর্কবার্তা স্বাদের মোহে নয়, এখন সময় নিরাপদ খাদ্য ও সুস্থ ভবিষ্যতের পক্ষে দাঁড়ানোর।
চিনির ইতিহাস : আখ থেকে বিশ্বজয়ের গল্প : চিনির ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। ধারণা করা হয়, ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রথম আখ থেকে মিষ্টি স্ফটিক জাতীয় পদার্থ তৈরি করা হয়েছিল। সংস্কৃত শব্দ ‘শর্করা’ থেকেই ইংরেজি ‘সুগার’ শব্দটির উৎপত্তি। পরবর্তীতে আরব বণিকরা চিনিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যায়, সেখান থেকে ইউরোপে। ঔপনিবেশিক যুগে আখ ও চিনি বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম শক্তিশালী পণ্যে পরিণত হয়। বাংলার গ্রামাঞ্চলেও একসময় প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে আখের রস জ্বাল দিয়ে গুড় ও অপরিশোধিত লাল চিনি তৈরির ঐতিহ্য ছিল। সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে; কিন্তু তার আড়ালে ঢুকে পড়েছে ভয়ংকর ভেজালের অন্ধকার।
চিনি আসে কোথা থেকে : বিশ্বে মূলত দুই উৎস থেকে চিনি তৈরি হয় আখ ও সুগার বিট। উষ্ণ অঞ্চলে আখ এবং শীতপ্রধান দেশে বিট থেকে চিনি উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশে মূলত আখ থেকেই চিনি তৈরি হয়। আখের রস সংগ্রহ করে তা জ্বাল, পরিশোধন, স্ফটিকায়ন ও শুকানোর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের চিনি উৎপাদন করা হয়।
অপরিশোধিত বা লাল চিনিতে আখের কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থেকে যায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত রিফাইনিং বা পরিশোধনের মাধ্যমে সাদা চিনিকে আরও ঝকঝকে ও মিহি করা হয়।
লাল চিনি আসলে কী : প্রকৃত লাল চিনি হলো আখের রস থেকে তৈরি অপরিশোধিত বা আংশিক পরিশোধিত চিনি। এতে কিছুটা মোলাসেস বা আখের প্রাকৃতিক উপাদান থেকে যায় বলে এর রং হালকা বাদামি বা লালচে হয়। এই চিনিতে অল্পমাত্রায় ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকতে পারে। তবে বাজারে বর্তমানে যেসব চকচকে লালচে চিনি বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশই প্রকৃত আখের চিনি নয়। অনেক ক্ষেত্রে সাদা চিনির সঙ্গে রাসায়নিক রং, টেক্সটাইল ডাই কিংবা কৃত্রিম ক্যারামেল মিশিয়ে তা ‘লাল চিনি’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে।
মিষ্টির আড়ালে বিষের কারবার : আখের খাঁটি লাল চিনির নামে বাজারে চলছে ভয়ংকর প্রতারণা। সাম্প্রতিক অভিযানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে শত শত কেজি ভেজাল লাল চিনি জব্দ করেছে, যেখানে সাদা চিনির সঙ্গে টেক্সটাইল রং মিশিয়ে তা ‘খাঁটি আখের চিনি’ নামে বিক্রি করা হচ্ছিল। এমনকি নামি প্রতিষ্ঠানের নকল মোড়ক ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর ভেবে ভোক্তারা বেশি দাম দিয়ে যে চিনি কিনছেন, বাস্তবে সেটিই হয়ে উঠছে বিষাক্ত রাসায়নিকের বাহক। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানুষের জীবন নিয়ে এই নির্মম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে আব্দুল জব্বার মণ্ডল এর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ভেজাল চক্রের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এই অভিযান আরও কঠোর ও বিস্তৃত হবে এবং ভেজাল চিনির মূল হোতাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে।
সাদা চিনি কীভাবে তৈরি হয় : আখের রস প্রথমে ছেঁকে বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় রং, গন্ধ ও অমেধ্য দূর করা হয়। শিল্পকারখানায় সালফার, ফসফরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে চিনি পরিশোধন করা হয়। পরিশেষে স্ফটিক আকারে শুকিয়ে তৈরি হয় ঝকঝকে সাদা চিনি। এই পরিশোধনের সময় আখের প্রাকৃতিক খনিজ ও অণুপুষ্টির বড় অংশ হারিয়ে যায়। ফলে সাদা চিনি মূলত উচ্চমাত্রার সুক্রোজ বা শর্করায় পরিণত হয়।
সাদা চিনি ও লাল চিনির পার্থক্য : লাল চিনিতে কিছু প্রাকৃতিক মোলাসেস থেকে যায়, ফলে এতে অল্প পরিমাণ খনিজ উপাদান থাকে। অন্যদিকে সাদা চিনি অধিক পরিশোধিত হওয়ায় তা তুলনামূলকভাবে বিশুদ্ধ সুক্রোজ। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লাল চিনি মানেই স্বাস্থ্যকর, আর সাদা চিনি মানেই বিষ- এমন সরলীকরণ বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি সঠিক নয়। উভয় চিনিতেই ক্যালোরি প্রায় সমান। পার্থক্য মূলত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অণুপুষ্টির সামান্য উপস্থিতিতে।
বাজারে ভেজাল চিনি চেনার কিছু উপায় : বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত আখের চিনি সাধারণত অতিরিক্ত ঝকঝকে হয় না। এতে আখের হালকা ঘ্রাণ থাকে। পানিতে দিলে কৃত্রিম রং দ্রুত আলাদা হয়ে গেলে বুঝতে হবে তাতে ভেজাল আছে। অতিরিক্ত ঝরঝরে ও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল লালচে চিনি সন্দেহজনক হতে পারে। তবে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে সবসময় ভেজাল চেনা সম্ভব নয়। তাই নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে কেনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এরিথ্রোসিন ও টেক্সটাইল রঙের ভয়াবহতা : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ভেজাল চিনিতে এরিথ্রোসিন বা ‘রেড ডাই-৩’ জাতীয় কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়। কিছু গবেষণায় এই রঙের সঙ্গে থাইরয়েড টিউমার ও ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যোপযোগী রংও ব্যবহার করছে না; ব্যবহার করছে শিল্পকারখানার টেক্সটাইল ডাই। এসব রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
চিনি কি সত্যিই ডায়াবেটিস বাড়ায়? ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত প্রশ্ন ‘চিনি খেলেই কি ডায়াবেটিস হয়?’ এর উত্তর কিছুটা জটিল। সরাসরি চিনি খেলেই ডায়াবেটিস হয় না; তবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, স্থূলতা, অলস জীবনযাপন এবং ইনসুলিন প্রতিরোধ তৈরি হওয়ার মাধ্যমে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বাড়ে।
অতিরিক্ত চিনি শরীরে দ্রুত গ্লুকোজ বাড়ায়। অগ্ন্যাশয় তখন বেশি ইনসুলিন নিঃসরণ করে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে শরীর ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এটিই ডায়াবেটিসের পথ তৈরি করে।
শিশুদের জন্য চিনির ভালো ও খারাপ দিক : শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই মিষ্টি স্বাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অল্প পরিমাণ চিনি তাৎক্ষণিক শক্তি দিতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি শিশুদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অতিরিক্ত চিনি শিশুদের স্থূলতা, দাঁতের ক্ষয়, মনোযোগ ঘাটতি, আচরণগত সমস্যা ও ভবিষ্যৎ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। কৃত্রিম রঙ মেশানো ভেজাল চিনি শিশুদের স্নায়বিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন মানুষ দৈনিক কতটুকু চিনি খেতে পারে : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) পরামর্শ দেয়, দৈনিক মোট ক্যালোরির ১০ শতাংশের কম ‘ফ্রি সুগার’ গ্রহণ করা উচিত। আরও ভালো ফলের জন্য তা ৫ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে দৈনিক প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা-চামচের বেশি অতিরিক্ত চিনি না খাওয়াই উত্তম। অথচ কোমল পানীয়, বিস্কুট, কেক, মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে অনেকেই অজান্তেই এর কয়েকগুণ বেশি চিনি গ্রহণ করছেন।
চিনির কিছু উপকারিতাও আছে : চিনি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়। শরীরের প্রধান শক্তির উৎস গ্লুকোজ, যা কার্বোহাইড্রেট থেকে আসে। শারীরিক পরিশ্রম, মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও বিপাকীয় কাজের জন্য শক্তি প্রয়োজন হয়। গুড় বা অপরিশোধিত আখের চিনিতে অল্পমাত্রায় আয়রন, ক্যালসিয়াম ও কিছু খনিজ উপাদান থাকতে পারে। তবে এগুলোকে পুষ্টির প্রধান উৎস ভাবা ভুল হবে। কারণ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শাকসবজি, ফলমূল ও সুষম খাদ্য থেকেই বেশি পাওয়া যায়।
অতিরিক্ত চিনির ক্ষতিকর দিক : অতিরিক্ত চিনি স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, দাঁতের ক্ষয় এবং প্রদাহজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে তরল চিনি যেমন কোমল পানীয় অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে মনে করেন পুষ্টিবিদরা। অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ লিভারে চর্বি জমাতে পারে। এতে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া অতিরিক্ত চিনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়িয়ে হৃদরোগের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করে।
সাদা চিনি কি বিষ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয় ‘সাদা চিনি হলো বিষ’। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি অতিরঞ্জিত বক্তব্য। তবে অতিরিক্ত সাদা চিনি অবশ্যই ক্ষতিকর। সমস্যাটি মূলত ‘অতিরিক্ত গ্রহণে’, শুধু ‘সাদা’ হওয়ার কারণে নয়। অন্যদিকে লাল চিনি বা গুড়েও ক্যালোরি ও শর্করা থাকে। ফলে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য সেটিও সীমিত মাত্রায় খেতে হবে।
কেন মানুষ লাল চিনির দিকে ঝুঁকছে : বর্তমান সময়ে মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন হচ্ছে। অনেকেই পরিশোধিত খাদ্যের বদলে প্রাকৃতিক বা কম প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। সেই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।
‘দেশি’ ‘প্রাকৃতিক’ ‘অর্গানিক’ ‘আখের চিনি’ এই শব্দগুলো ব্যবহার করে মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে পুঁজি করা হচ্ছে। অথচ পণ্যের প্রকৃত মান যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা এখনও দুর্বল।
ভোক্তাদের করণীয় কী : প্রথমত, অচেনা ও সন্দেহজনক ব্র্যান্ডের চকচকে লাল চিনি এড়িয়ে চলা উচিত। নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে চিনি কিনতে হবে। প্যাকেটে প্রস্তুতকারকের ঠিকানা, বিএসটিআই অনুমোদন ও উৎপাদনের তথ্য যাচাই করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে। শিশুর খাবারে অপ্রয়োজনীয় চিনি ব্যবহার কমানো উচিত। চা বা শরবতে ধীরে ধীরে কম চিনি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায় : খাদ্যে ভেজাল শুধু ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ। শুধু সামান্য জরিমানা দিয়ে এই অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। ভেজাল চিনির মূল উৎপাদক, আমদানিকারক ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজার তদারকি জোরদার, নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষা, ভেজালবিরোধী বিশেষ অভিযান এবং দ্রুত বিচার এসব কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
দেশীয় চিনিশিল্পকে বাঁচানোও জরুরি : বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। অথচ নিরাপদ ও মানসম্পন্ন আখের চিনি উৎপাদনে দেশীয় শিল্পের সম্ভাবনা এখনও বিশাল। কৃষক ও স্থানীয় উৎপাদকদের সহায়তা করা গেলে নিরাপদ অপরিশোধিত চিনির বাজার তৈরি হতে পারে। দেশীয় শিল্প ধ্বংস হলে বাজার পুরোপুরি অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাবে। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
খাদ্যাভ্যাস বদলানোর সময় এসেছে : আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন খাবারের স্বাদ নয়, নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ঝকঝকে মোড়ক আর বিজ্ঞাপনের ভাষায় মুগ্ধ হয়ে অজান্তে বিষ খাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চিনি খাওয়া যাবে, তবে বুঝে-শুনে, সীমিত পরিমাণে এবং নিরাপদ উৎস থেকে। সবচেয়ে বড় কথা, মিষ্টির প্রতি অন্ধ আসক্তির বদলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে, একটি জাতির সুস্থ ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার খাদ্যের নিরাপত্তা, মানুষের সচেতনতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার ওপর। কিন্তু যখন আখের খাঁটি লাল চিনির নাম ব্যবহার করে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে একশ্রেণির নিষ্ঠুর অসাধু ব্যবসায়ী মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে বিষ ঢুকিয়ে দেয়, তখন তা শুধু ভেজাল বাণিজ্য নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধে পরিণত হয়।
শিশুর দুধ, পরিবারের চায়ের কাপ কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে যারা ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। মানুষ আজ নিরাপদ খাদ্য চায়, সুস্থ ভবিষ্যৎ চায়, প্রতারণামুক্ত বাজার চায়। তাই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযানে আরও কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নেবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এসব ভেজাল চিনির মূল উৎপাদক, মজুতদার ও বাজারজাতকারী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে এমন প্রত্যাশাই আজ কোটি মানুষের। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে ওঠে, যখন সে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে মুনাফার চেয়ে বড় করে দেখে। নিরাপদ খাদ্য শুধু একটি অধিকার নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক নিশ্চয়তা।
জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট