প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ মে, ২০২৬
এক বাদশাহ এক দাসীর প্রতি প্রেমাসক্ত হওয়া এবং দাসীকে খরিদ করে আনার কাহিনি মূল কাহিনি বর্ণনার আগে নিকলসন সংকলিত মসনবির চেয়ে মাওলানা আশরফ আলি থানবি (রহ.) প্রণীত কলিদে মসনবিতে অতিরিক্ত দুটি বয়েত রয়েছে। যেমন-
ইন হাকিকত রা শোনু আজ গুশে দেল
তা বুরুন আয়ি বে কুল্লি যাব ও গেল
মনের কানে শোনো এই সারসত্য হাকিকত
যাতে পানি ও কাদা থেকে পাও পুরোপুরি রোখসত।
অর্থাৎ দেহের ভোগ-বিলাসের বন্ধন থেকে যাতে মুক্ত হও।
ফাহম গের্দ আরিদ ও জান রা রাহ দাহিদ
বাদ আযান আয শওক পা দার রাহ নাহিদ
জ্ঞান-বুদ্ধি জড়ো কর আর প্রাণের দুয়ার খুলে দাও
এরপর প্রবল উদ্দীপনায় (সাধনার) পথে পা বাড়াও।
বুদ শাহি দার যামানি পিশ আযিন
মুলকে দুন্য়া বুদাশ ও হাম মুল্কে দিন
আগেকার দিনে এক বাদশাহ ছিলেন যার ছিল দুনিয়ার রাজত্ব, সাথে ধর্মীয় কর্তৃত্ব।
এত্তেফাকান শাহ রুজি শুদ সওয়ার
বা খাওয়াচ্ছে খিশ আয বাহরে শেকার
ঘটনাক্রমে বাদশাহ একদিন অশ্বারোহণে
শিকারের উদ্দেশে রওনা হলেন সহচর সমেত।
যেতে যেতে-
বাহরে সাইদি মি শুদ উ বার কুহ ও দাশ্ত
নাগাহান দার দামে এশ্ক্ উ-সাইদ গাশ্ত্
শিকারে যাচ্ছিলেন তিনি পাহাড় উপত্যকা পাড়ি দিয়ে
কিন্তু হঠাৎ নিজেই শিকার হলেন প্রেমের ফাঁদে।
য়্যক কানিযাক দিদ শাহ বার শাহ্ রাহ
শুদ গোলামে আন কানিযাক জানে শাহ
মহাসড়কের ওপর দেখলেন শাহ এক তরুণী দাসী
বাদশাহর প্রাণ হয়ে গেল সেই দাসীর ক্রীতদাসী।
অবস্থা এমন হলো যে-
মোর্গে জানশ্ দার কাফাস্ চোন মি তাপিদ
দাদ মাল ও আন কানিযাক রা খারিদ
তার প্রাণপাখি দেহ পিঞ্জরে যখন ধরফড় শুরু করল। অনেক টাকার বিনিময়ে দাসীকে খরিদ করে নিলেন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক হয়ে গেল-
চোন খারিদ উ রা ও-বারখোর্দার শুদ
আন কানিযাক আয কাযা বিমার শুদ
দাসীকে খরিদ করে যখন ঘরে তুলে আনলেন, ভাগ্যক্রমে সে দাসী রোগে আক্রান্ত হলো। মনে হয় এটিই নিয়তির শাশ্বত বিধি-
আন য়্যকি খার দাশ্ত্ ও পালানাশ নাবুদ
য়াফত পালান গোর্গ খাররা দার রুবুদ
এক লোকের গাধা ছিল কিন্তু গাধায় বসার গদি ছিল না, গদি জোগাড় হল তো নেকড়ে এসে গাধা ছিনিয়ে নিল।
কুযে বুদেশ আব মি নামদ বেদাস্ত
আবরা চোন য়াফত খোদ কুযে শেকাস্ত
কারো কলসী ছিল, ছিল না পানির যোগাড়
যখন পানি পেল একদিন ভেঙে গেল কলস তার।
পার্থিব জীবনের ধর্মই এটি। একটা মিলে তো আরেকটা মিলে না। সব ইচ্ছা একসঙ্গে পূরণ হয় না, সব সুখ একসাথে পাওয়া যায় না। বস্তুত প্রকৃতির এই শাশ্বত নিয়ম মেনেই জীবন যুদ্ধে সফল হতে হয়। বাদশাহ উপায়ান্তর খুঁজতে লাগলেন।
শাহ তবিবান জাম কার্দ আয চাপ ও রাস্ত
গুফ্ত্ জানে হার দো দার দাস্তে শুমাস্ত
বাদশাহ ডান বাম থেকে জড়ো করলেন ডাক্তারদের,
বলে দিলেন, উভয়ের প্রাণ কিন্তু হাতে আপনাদের।
শুধু তাই নয়-
জানে মান সাহ্লাস্ত, জানে জানাম্ উস্ত
দার্দমান্দ ও খাস্তে আম, দারমানাম্ উস্ত
আমার প্রাণ তো সহজ, আমার প্রাণের প্রাণ হলো সে,
আমি ব্যথিত ক্লান্ত আমার একমাত্র চিকিৎসা সে।
হারকে দারমান কার্দ মার জানে মোরা
বোর্দ গাঞ্জ ও দুররো মারজানে মোরা
আমার প্রাণের চিকিৎসা করে, যে সুস্থ করবে তাকে
নিশ্চিত সে আমার মণি-মাণিক্যের ভাণ্ডার পাবে।
বাদশাহর আবেগপূর্ণ বক্তব্য আর পুরস্কারের ঘোষণা শুনে ডাক্তাররা-
জুমলা গোফতান্দাশ কে জানবাজি কুনিম
ফাহ্ম গের্দ আরিম ও আন্বাযি কুনিম
সবাই তাকে জানালেন, আমরা প্রাণবাজি রাখব
জ্ঞান-অভিজ্ঞতা জড়ো করে সহযোগিতায় কাজ করব।
সাফল্যের ব্যাপারে আমরা আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি। কারণ-
হার য়কি আয মা মসিহে আলমিস্ত
হার আলম রা দার কাফে মা মারহামিস্ত
আমরা প্রত্যেকেই বিশ্বখ্যাত মসীহতুল্য
যে কোনো রোগের চিকিৎসা আমাদের মুঠোয়।
‘মসীহ’ হজরত ইসা (আ)-এর উপাধি। যাকে যিশুও বলা হয়। তিনি হাত বুলিয়ে দিলে জন্মান্ধ ভালো হয়ে যেত। আল্লাহর নাম ধরে ডাক দিলে মৃত লোক কবর থেকে জিন্দা হয়ে বেরিয়ে আসত। তাই তিনি অসাধারণ অলৌকিক চিকিৎসকের দৃষ্টান্ত। ডাক্তাররা নিজেদের মসিহের সাথে তুলনা করলেন। কিন্তু তাদের এই আত্মবিশ্বাস সীমা ছাড়িয়ে গেল।
গার খোদা খাহাদ নাগোফতান্দ আজ বতর
বস খোদা বেনামুদেশান ইজযে বশর
‘আল্লাহ যদি চান’ কথাটি বললেন না অহংকারবশত
ফলে আল্লাহ তাদের দেখিয়ে দিলেন মানুষের অক্ষমতা।
‘আল্লাহ যদি চান’ অর্থাৎ ইনশাআল্লাহ বলা আল্লাহতে সমর্পিত বান্দাদের অলংকার। কুরআন মজীদে সুরা কলমে (৬৮) ইনশাআল্লাহর গুরুত্ব বর্ণনায় একটি অমূল্য শিক্ষনীয় ঘটনা আছে। তারই তাৎপর্য ব্যক্ত হয়েছে এখানে। ইনশাআল্লাহ অতিমাত্রার আত্মবিশ্বাস আর অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে, আল্লাহর শক্তির সঙ্গে মানুষের চেষ্টাকে সংযুক্ত করে। কিন্তু ডাক্তাররা এই সত্যটি বুঝতে পারেননি। তারা ভুল করেছেন। তবে এই ইনশাআল্লাহ বলতে কেবল মৌখিক উচ্চারণ উদ্দেশ্য নয়, মনের অনুভূতি অভিব্যক্তিই বিবেচ্য। মওলানা বিষয়টি বুঝিয়ে বলছেন-
তরকে এস্তেস্না মোরাদম ক্বাসওয়াতিস্ত
না হামিন গোফতান কে আরেয হালতিস্ত
ইনশাআল্লাহ ত্যাগ বলতে মনের রুক্ষতাই বুঝাতে চাই
নিছক মুখে উচ্চারণ নয়, তা তো স্রেফ কৃত্রিমতা।
এই বসি না ওয়ার্দে এস্তেস্না বেগোফ্ত্
জানে উ বা জানে এস্তেস্নাস্ত জোফ্ত্
বহু লোক আছেন যারা মুখে ইনশাআল্লাহ উচ্চারণ না করলেও, তাদের প্রাণ ইনশাআল্লাহর প্রাণ (পুরুষ)-এর সঙ্গে সদা যুক্ত।
কথায় কথায় ইনশাআল্লাহ বলা উদ্দেশ্য নয়। তাতে কৃত্রিমতা থাকতে পারে, অভ্যাসের কারণেও উচ্চারণ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর এমন অনেক বান্দা আছেন, যারা কথায় কথায় ইনশাআল্লাহ না বললেও তাদের হৃদয়মন যুক্ত থাকে ইনশাআল্লাহর মূল উৎস মহান আল্লাহর সাথে। এই গল্পে মাওলানা রুমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা এটি। ক্রমান¦য়ে দাসীর অবস্থা এমন নাজুক হয়ে গেল যে,
হারচে কার্দান্দ আয এলাজ ও আয দাওয়া
গাশ্ত্ রাঞ্জ আফযুন ও হাজত না রাওয়া
তারা যত চিকিৎসা করলেন, ওষুধ দিলেন
রোগ আরও বাড়তে লাগল, সমস্যা রয়েই গেল।
আন কানিযক আয মরয চোন মুয় শুদ
চাশ্মে শাহ আয আশ্কে খূন চোন জুয় শুদ
রোগের কারণে দাসী চুলের মতো শীর্ণ হয়ে গেল
(ওদিকে) রক্তের অশ্রুতে বাদশাহর দু’নয়ন ঝর্না হলো।
আয কাযা সারকাঙ্গাবীন সাফরা নমুদ
রওগনে বাদাম খুশকি মি ফযুদ
দুর্ভাগ্য যে, সেকানজাবীন পিত্তরস উৎপন্ন করল
বাদাম তেল শরীরের শুষ্কতা আরও বাড়িয়ে দিল।
আয হালিলা কবয শুদ এতলাক রাফ্ত
আব আতাশ রা মদদ শুদ হামচো নাফ্ত্
হরিতকী পেট নরম না করে কোষ্ঠ-কাঠিন্য সৃষ্টি করল
পানি কেরোসিনের ন্যায় আগুনের সাহায্যকারী হলো।
পুরনো হেকিমী চিকিৎসায় পিত্তরসের কারণে সেকানজাবীনকে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
অম্লরসের সঙ্গে মধু বা চিনি মিশিয়ে প্রস্তুত সিরাপবিশেষ এই সেকানজাবীন বাদাম তেল ব্যবহৃত হতো কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য। হরিতকী বাদাম তেলের বিপরীত শরীর কষা করার জন্য প্রয়োগ হতো। কিন্তু দাসীর চিকিৎসায় ডাক্তারদের যাবতীয় ওষুধ প্রয়োগ এবং সকল প্রচেষ্টার ফল উল্টা হতে লাগল।