ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস : বাসযোগ্য পৃথিবী ও বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস : বাসযোগ্য পৃথিবী ও বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

প্রকৃতি মানুষের জীবনে এক পরম আশীষ, অথচ আজ আমাদের অবহেলায় সেই আশীর্বাদই অভিশাপে রূপ নিতে চলেছে। প্রকৃতির এই নীরব কান্না বোঝার এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও নিরাপদ আবাসস্থল ফিরিয়ে দেওয়ার এখনই মোক্ষম সময়। বিশ্বব্যাপী পরিবেশের এই বিপন্ন দশা এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার প্রত্যয় নিয়েই আমাদের আজকের এই পথচলা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের এই প্রিয় নীল গ্রহটি আজ নানামুখী সংকটে জর্জরিত হয়ে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্ম জ্বালানি দহন বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ এবং অনিয়মিত আবহাওয়ার জন্ম দিচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিপজ্জনক সীমা অতিক্রমের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি।

মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হওয়া পৃথিবীর ভারসাম্যকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। প্রতি বছর লাখ লাখ হেক্টর অরণ্য কেটে ফেলার কারণে কোটি কোটি বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ তাদের চেনা বাসস্থান হারাচ্ছে। বন নিধনের এই সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতের চক্রে, যার ফলে কোথাও দেখা দিচ্ছে চরম খরা আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা। প্রাকৃতিগত এই বিপর্যয় বিশ্বজুড়ে বাস্তুসংস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পৃথিবীর মহাসাগর এবং নদীগুলো আজ মানুষের তৈরি বর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন টন টন অবিয়োজনযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী জলাশয়ে নিক্ষেপ করার ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র?্য বিপন্ন হচ্ছে। প্লাস্টিকের কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সামুদ্রিক মাছের মাধ্যমে ঘুরেফিরে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এবং কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে। বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধূলিকণার কারণে পৃথিবীর প্রধান প্রধান শহরগুলোর বাতাস বিষে পরিণত হয়েছে, যা নিঃশ্বাসের অযোগ্য। মাটি, পানি ও বায়ুর এই ত্রিমুখী দূষণ সামগ্রিকভাবে পুরো পৃথিবীকে একটি জীবন্ত নরকে পরিণত করছে, যেখানে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের দিকে তাকালে পরিবেশের এই ক্ষত আরও স্পষ্ট এবং ভয়াবহ রূপ নিয়ে সামনে আসে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর বাতাস আজ পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় বারবার শীর্ষ স্থান দখল করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ইটের ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া এবং পুরাতন যানবাহনের কার্বন নির্গমনের ফলে সাধারণ মানুষ ফুসফুসের ক্যানসার ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাস আজ এ দেশে এক পরম বিলাসিতা।

এ দেশের জীবনরেখা নদীগুলো আজ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে তুরাগ নদের পানি কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য আর অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্যের কারণে কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধময় হয়ে গেছে। নদীতে কোনো অক্সিজেন না থাকায় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আর নদীর তীরবর্তী মানুষজন চর্মরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি চাষাবাদের জমিতে প্রবেশ করায় বাংলাদেশের কৃষি খাত এক বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার মিষ্টি পানির উৎসগুলো লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাস্তুচ্যুত হয়ে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যরে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাংলাদেশের পরিবেশকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের ড্রেন ও নর্দমাগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে গিয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। এই বর্জ্যগুলো মাটির নিচে জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দিন দিন আরও নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন এবং পার্বত্য বনাঞ্চল আজ একশ্রেণির ভূমিদস্যুদের কারণে উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বনের গাছ কেটে ইটের ভাটায় পোড়ানো এবং বন্যপ্রাণী শিকারের ফলে আমাদের প্রাকৃতিক ঢালগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে সিডর, আইলার মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো এখন সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানছে এবং প্রতি বছর দেশের অর্থনীতি ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। এই অন্ধকারময় পরিস্থিতি থেকে পৃথিবীকে আগামী প্রজন্মের জন্য আবার বাসযোগ্য করে তুলতে হলে আমাদের এখনই বৈশ্বিক স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে সূর্যরশ্মি, বায়ুপ্রবাহ এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের দিকে দ্রুত ধাবিত হতে হবে। উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক পর্যায়ে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও একক ব্যবহারের প্লাস্টিক সামগ্রী নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প তন্তু বা পাটের তৈরি পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বনাঞ্চল উজাড়ের হার শূন্যে নামিয়ে এনে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতির নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার করা জরুরি। তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবায়ু তহবিল গঠন করে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিশ্বের প্রতিটি নাগরিককে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাংলাদেশকে আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ও সবুজ আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সর্বপ্রথম, দেশের বায়ুদূষণ রোধে শহরের চারপাশে থাকা অবৈধ ইটের ভাটাগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং সব ধরনের গণপরিবহনে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রচলন করতে হবে। কলকারখানায় কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যন্ত্রের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা এবং সবুজ বেষ্টনী বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের সব নদীতে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে প্রতিটি শিল্প-কারখানায় বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকরী ‘বর্জ্য শোধনাগার’ বা ইটিপি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নদী দখলকারীদের কঠোর আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীগুলোর নাব্যতা ও স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের পানির উৎসগুলো দূষণমুক্ত রাখা আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত।

প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করে পাটের তৈরি সোনালী ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ‘রিসাইক্লিং’ বা পুনরুৎপাদন পদ্ধতি চালু করতে হবে, যাতে কোনো বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে বা জলাশয়ে পতিত না হয়। উৎসস্থলেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক হারে ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ততাসহিষ্ণু বনের দেয়াল তৈরি করতে হবে। খরা ও বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য জলবায়ু-সহিষ্ণু ও কম পানির কৃষিব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার আধুনিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। টেকসই শহর গড়ে তুলতে প্রতিটি ভবনের ছাদে ছাদবাগান এবং জলাধার বা ‘স্পঞ্জ সিটি’র ধারণা বাস্তবায়ন করতে হবে।

দেশের পাঠ্যপুস্তকে পরিবেশ শিক্ষার গুরুত্ব বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন প্রজন্মের মনে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। তরুণ সমাজকে পরিবেশ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই শুধু আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশকে আবার রূপসী বাংলায় রূপান্তর করতে পারে। পরিবেশ সচেতনতার এই বৈশ্বিক লড়াইয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে। সেই সম্মেলনের প্রথম দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ ৫ই জুনকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৭৪ সাল থেকে এটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হলো পৃথিবীর সর্বস্তরের মানুষকে প্রকৃতির প্রতি তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

বর্তমান ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে আজারবাইজান এবং এর মূল অনুষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজধানী বাকুতে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে: ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত