প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমানে বিষাদ ও আতঙ্কের এক প্রতিশব্দ ডেঙ্গু জ্বর। প্রতিবছর হাজারো মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, অনেকে পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ ডেঙ্গু মহামারির সম্মুখীন হয়েছিল, তাতে সরকারি হিসাবে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন আক্রান্ত এবং ১৬৪ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এ আতঙ্ক কমেনি; বরং ২০২৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত ও ৪১৩ জনের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আর চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশজুড়ে ৪৯ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় দেড়'শ জন। মশা নিধনে বছরের পর বছর ধরে ফগিং মেশিনের ধোঁয়ায় আকাশ মেঘলা করে ফেলা হলেও মশার উপদ্রব কমার কোনো লক্ষণ নেই। এর পেছনের কারণ কি কেবলই আমাদের অসতর্কতা, নাকি গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো বিজ্ঞানসম্মত সত্য? প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু 'এডিস ইজিপ্টাই' মশা এখন আর প্রচলিত রাসায়নিক অস্ত্রে ভয় পায় না; বরং সে নিজেই হয়ে উঠেছে এসব অস্ত্রের বিরুদ্ধে এক অজেয় যোদ্ধা। পাইরেথ্রয়েড-জাতীয় কীটনাশক, বিশেষ করে পারমেথ্রিনের বিরুদ্ধে এডিস মশা ব্যাপক প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশনগুলো যে ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাতে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই পারমেথ্রিন। তবে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত মশার ওপর এই ওষুধের প্রমিত (স্ট্যান্ডার্ড) মাত্রা প্রয়োগ করে হতাশাজনক ফলাফল পেয়েছেন। ঢাকার মালিবাগ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা মশার ক্ষেত্রে প্রমিত মাত্রায় মৃত্যুর হার ছিল শূন্য; অর্থাৎ, ওষুধের কোনো প্রভাবই এদের ওপর পড়েনি। রাজশাহীর মশার ক্ষেত্রেও মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ১৪.৮ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা ওষুধের মাত্রা দ্বিগুণ করে পরীক্ষা চালালেও মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ৪৪.৪ শতাংশের বেশি ওঠেনি। একবার ভেবে দেখুন, ফগিং মেশিনের যে বিষাক্ত ধোঁয়ায় আমরা নিয়মিত নিশ্বাস নিচ্ছি, তাতে মশা মরছে না; বরং আমরা কেবল নিজেদের শ্বাসযন্ত্রেরই ক্ষতি করছি। অন্যদিকে মশাগুলো সেই ধোঁয়া ভেদ করে বেঁচে থাকছে এবং ঠিকই রক্ত শোষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। শুধু পারমেথ্রিনই নয়, ডেল্টামেথ্রিন ও ম্যালাথিয়নের মতো অন্যান্য কীটনাশকের বিরুদ্ধেও মশার প্রতিরোধক্ষমতার এক জটিল চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকার উত্তরা থেকে সংগৃহীত মশার ক্ষেত্রে ডেল্টামেথ্রিনের প্রমিত মাত্রায় মৃত্যুর হার ১০০ শতাংশ হলেও গুলশান ও কড়াইলের মশার ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ৪৯ শতাংশ। একইভাবে বান্দরবানের মশার ক্ষেত্রে ডেল্টামেথ্রিন প্রয়োগে মৃত্যুর হার পাওয়া যায় ৬৭ শতাংশ, যা মশার প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠারই অকাট্য প্রমাণ। ম্যালাথিয়নের ক্ষেত্রেও প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে; যেখানে গুলশান ও কড়াইলের মশার মৃত্যুর হার ৬২.৯ শতাংশ এবং বান্দরবানের ক্ষেত্রে তা ৭৫.৭ শতাংশ। এসব তথ্য জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে মশার এই প্রতিরোধক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নেই; বরং তা ছিটমহলের মতো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে দেশজুড়ে শুধু একটি কীটনাশক দিয়ে সব এলাকার মশা নিধনের সর্বজনীন সমাধান যে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ব্যর্থ হতে বাধ্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন প্রশ্ন হলো, একটি সাধারণ মশা কীভাবে এত শক্তিশালী রাসায়নিকের বিরুদ্ধে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করল? বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত মশার দেহে ডিটক্সিফাইং এনজাইম, বিশেষ করে এস্টারেজ এবং মিক্সড-ফাংশন অক্সিডেসের মাত্রা সংবেদনশীল রেফারেন্স স্ট্রেইনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সহজ কথায়, মশার দেহে এমন একধরনের 'রাসায়নিক কারখানা' তৈরি হয়েছে, যা শরীরে প্রবেশ করা বিষকে কার্যকর হওয়ার আগেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এসব মিউটেশন মশার স্নায়ুতন্ত্রকে এমনভাবে বদলে দেয় যে কীটনাশক আর তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে যুক্ত হতে পারে না। অর্থাৎ, আমরা যখন বিষ ছিটাচ্ছি, মশা তখন জিনগত বর্ম পরে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে— যা মশার বিরুদ্ধে আমাদের রাসায়নিক যুদ্ধকে এক হেরে যাওয়া লড়াইয়ে পরিণত করেছে। এমন হতাশাজনক পরিস্থিতির মাঝেও একটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল মিলেছে; আর তা হলো 'বেনডিওকার্ব' নামক কার্বামেট-জাতীয় কীটনাশক। পরীক্ষণে অংশ নেওয়া দেশের সব কটি এলাকার এডিস ইজিপ্টাই মশার ক্ষেত্রে বেনডিওকার্ব প্রয়োগে মৃত্যুর হার ছিল শতভাগ; অর্থাৎ, মশাগুলো এই ওষুধের প্রতি এখনও পুরোপুরি সংবেদনশীল। কিন্তু এখানেই শুরু হয় বাস্তবতার সঙ্গে বিজ্ঞানের করুণ সংঘাত। বাংলাদেশে বর্তমানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বেনডিওকার্ব-সংবলিত কোনো কীটনাশক সরকারিভাবে নিবন্ধিত বা অনুমোদিত নয়।
ফলে পরীক্ষাগারে এ ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও আপাতত মাঠপর্যায়ে তা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। ম্যালাথিয়নকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হলেও কৃষিকাজে দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ফলে পরিবেশে এরইমধ্যে এর একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর ভাবনার বিষয়; যেখানে বিজ্ঞান সমাধানের পথ দেখালেও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতায় তা বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ হয়ে আছে। অতএব, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল রাসায়নিক ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করা একধরনের মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি মাত্র। মশা নিধনের কৌশলে এখন আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যেখানে 'সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা'ই হতে হবে মূলমন্ত্র। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্লাস্টিকের ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার ও নির্মাণসামগ্রীতে জমে থাকা পানিই এডিস মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র। তাই রাসায়নিকের অযৌক্তিক ব্যবহার কমিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে এসব প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পথ। পাশাপাশি জৈবিক নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি এবং মশার কীটনাশক প্রতিরোধ সক্ষমতার ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে সময় ও স্থানভেদে কোন ওষুধটি কার্যকর, তা বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্ধারণ করা যায়। আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই এখন আর শুধু শক্তিশালী বিষের ওপর নির্ভর করছে না; বরং তা নির্ভর করছে সম্মিলিত সচেতনতা, বিজ্ঞানমনস্ক পদক্ষেপ এবং প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার ওপর।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট