ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কাউন্সিলর বাপ্পির নির্দেশে গুলি করে ফয়সাল

কাউন্সিলর বাপ্পির নির্দেশে গুলি করে ফয়সাল

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত শেষে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। গতকাল বিকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম। এক প্রশ্নের জবাবে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদি নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেই রাজনীতির কারণেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর (বাপ্পী) নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামি এবং গুলিবর্ষণকারী হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও তার সহযোগী আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। তবে এই তিনজনের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তারা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে ডিবি।

এছাড়া এ ঘটনায় গুলিবর্ষণকারী ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি এবং ফিলিপ নামে একজন পলাতক আছেন। এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের সুযোগ রয়েছে বলে জানান শফিকুল ইসলাম।

হত্যার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদি বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ সংগঠনের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য দিতেন। তার এ ধরনের বক্তব্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হন। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি বেশ কিছু দিন ধরে গণসংযোগ করে আসছিলেন। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তাকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।

ভিডিও বার্তা নিয়ে যা বলল ডিবি : আসামি ফয়সাল করিম সম্প্রতি একাধিক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, তিনি বিদেশে আছেন এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলায় তাকে ও তার পরিবারকে ফাঁসানো হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ফয়সালের ভিডিও বার্তা পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ফয়সাল তিনটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন, সেগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়নি, এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনও আসেনি, তবে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ভিডিও বার্তা আসল। তবে ফয়সাল দুবাইতে থাকার যে দাবি করছেন, সেই অবস্থান সঠিক নয়। তদন্তের তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, পলাতক ফয়সাল ভারতে অবস্থান করছেন।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার তথ্য : ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ওয়ার্ড কমিশনার তাইজুল ইসলাম ওরফে বাপ্পী। এই নির্দেশের কারণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, শরিফ ওসমান হাদি একটি নতুন ধরনের রাজনীতি শুরু করছিলেন এবং তার বক্তৃতার মাধ্যমে সরকার, আওয়ামী লীগ বা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিলর এই সমালোচনার কারণেই ফয়সালকে হত্যা করতে বলেন।

এ হত্যা মামলার তদন্তকালে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ‘পজিটিভ’ এসেছে বলেও জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম। ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগে মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে যে বক্তব্য ডিএমপি এর আগে দিয়েছিল, তা সত্য বলেও জানান ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম।

হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ : শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারসহ চার দফা দাবিতে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি পালন করেছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর শাহবাগ থেকে এ পথযাত্রা শুরু হয়। ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা ১০টি পিকআপভ্যান ও ট্রাক নিয়ে এ কর্মসূচি চালায়। ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ পথযাত্রাটি সায়েন্স ল্যাব, সিটি কলেজ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর- ১০, উত্তরা, বসুন্ধরা, বাড্ডা, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী হয়ে সন্ধ্যায় শাহবাগে পৌঁছে।

শাহবাগে কর্মসূচি শুরুর আগে ইনকিলাব মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতেই আমাদের এই কর্মসূচি। তিনি আরও বলেন, ‘ফয়সাল করিম মাসুদ একা কি ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে? সে এই হত্যাকাণ্ডের সামান্য অংশীজন। মূল পরিকল্পনাকারী ও বড় মাছদের নাম বাদ দিয়ে যদি পুলিশ চার্জশিট দেয়, আমরা তা মানব না।’ মার্চ ফর ইনসাফ কর্মসূচি থেকে ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’ ও ‘হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেব না’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হয়।

ইনকিলাব মঞ্চের চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে- খুনি, হত্যার পরিকল্পনাকারী, সহযোগী ও আশ্রয়দাতাসহ পুরো খুনি চক্রের বিচার আগামী ২৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে; বাংলাদেশে অবস্থানরত সব ভারতীয় নাগরিকের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করতে হবে; ভারতে আশ্রয় নেওয়া খুনিদের ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে হবে এবং সিভিল ও মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিস্ট দোসরদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গেল ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় হাদির মৃত্যু হয়। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলাটি দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়।

ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাকে সহায়তাকারী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করার কথা জানায় পুলিশ। তারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার জোর গুঞ্জন শোনা গেলেও পুলিশ শুরুতে কিছু বলছিল না। পরে ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ফয়সাল ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন। মেঘালয় পুলিশ তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত