ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

‘পাতানো’ নির্বাচনের শঙ্কা জামায়াতের

‘পাতানো’ নির্বাচনের শঙ্কা জামায়াতের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। এর মধ্যেই আসন্ন নির্বাচন ‘পাতানো’ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে তার বসুন্ধরা কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। তিনি বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুদিন ধরে ‘একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের’ দিকে ‘ঝুঁকে পড়েছে’। এতে করে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ‘পাতানো নির্বাচনে’ রূপান্তরিত হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

জামায়াতের নায়েবে আমির তাহের বলেন, ‘গত এক দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশে সরকার এবং আমাদের ‘ল’ এনফর্সিং অথরিটি’ যারা আছে ইনক্লুডিং সেনাবাহিনী যেভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে এবং প্রশাসন যেভাবে একটা দলের আনুগত্য দেখাচ্ছে; এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে আগামী নির্বাচনটি কি আবার পাতানো নির্বাচন হবে কী না অতীতের নির্বাচনগুলোর মতো। আমরা মনে করি এ ধরনের পাতানো নির্বাচন বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।’

নিরপেক্ষ হয়ে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য ভূমিকা রাখতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘আমরা বলেছি যে বাংলাদেশে একটা ফেয়ার এবং ক্রেডিবল ইলেকশন অত্যন্ত জরুরি। কারণ বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের যে ক্রাইসিস তৈরি হয়েছিল এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সুষ্ঠু এবং সঠিক নির্বাচনের অভাব।’

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্ট ‘অচলাবস্থা’ নিরসনে সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচন প্রয়োজন বলে জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে বলে মন্তব্য করে দলটির নায়েবে আমির বলেন, ‘যদি আগামী নির্বাচনটি অবাধ এবং সুষ্ঠু না হয়, নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে ক্রাইসিস কিন্তু শেষ হবে না। ক্রাইসিস আবার নতুন করে তৈরি হবে এবং এটা আরও গভীরতর হবে।’

দলের পক্ষ থেকে এ আশঙ্কার কথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তাহের। সংসদ নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক পাঠানোকে কেন্দ্র করে মূল আলোচনা হলেও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আসন্ন নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যবেক্ষক পাঠাবে বলে প্রতিনিধি দল আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বলে জানান তাহের। তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনেই বিদেশি পর্যবেক্ষক পাঠানোর জন্যে তারা এগ্রি করেছে এবং বাংলাদেশও করেছে। কারণ এর আগের নির্বাচনগুলো আসলে পার্টিসিপেটেড ছিল না। আমরা বলেছি আমরা এটাকে ওয়েলকাম করি।’ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দেশ-বিদেশের অংশীজনদের নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় জামায়াতে ইসলামী ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাহের। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদেরকে আশ্বস্ত করেছি, নির্বাচন সুষ্ঠু এবং অবাধ হওয়ার জন্যে যা কিছু করার প্রয়োজন, জামায়াতে ইসলামী সেটা করবে এবং সহযোগিতা করবে।’

ইসিকে পক্ষপাতদুষ্ট ডিসি-এসপিদের সরিয়ে দিতে বলল জামায়াত : জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে অনেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) পক্ষপাত করছেন। তারা একটা রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করছেন। নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) পক্ষপাতদুষ্ট ডিসি-এসপিদের আমরা সরিয়ে দিতে বলেছি। বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে কোনো কোনো জায়গায় কোথাও কোথাও গ্রহণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বাতিল করা হয়েছে। যেমন বিএনপির আব্দুল আউয়ালের মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়েছে। মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ তারও দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে। আমাদের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে মামলায় দুইরকম সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা বলেছি, দলীয় পক্ষপাত করছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। আমরা সে সকল রিটার্নিং কর্মকর্তা ও এসপিকে সরিয়ে দিতে বলেছি, যারা একটা পলিটিক্যাল পার্টিকে বিলং করতে চান, তাদের সরিয়ে দিতে বলেছি।

জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, নির্বাচনের সময় একজনকে অনেক প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে। যেটা মানুষের মাঝে ইম্প্রেশন আসতে পারে, হি বিকাম সামথিং। তারা বলেছেন, নীতিগতভাবে আমরা বিষয়টি দেখব। এ ছাড়া একটি দলের পক্ষ থেকে কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে— ক্ষমতায় গেলে বিতরণ করা হবে। এটা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বলেন, আমরা সিসিটিভির কথা বলেছি। ওনারা ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে এটা করবে। নির্বাচন একতরফা করে একটি দল নির্বাসনে আছে। এখন আরেকটি দল এমন করলে তারাও নির্বাসনে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে তো আর বাংলাদেশে কোনো দল থাকবে না। আমরা বলেছি আপনাদের মাঠে প্রমাণ করতে হবে। আমরা স্পেসিফিক কোনো তালিকা দেইনি ডিসি-এসপিদের। আমরা পর্যবেক্ষণ করব, তারপর তালিকা দেব। প্রটেকশনের নামে যে বাড়াবাড়ি চলছে, এতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। ভারতের সঙ্গে ফরমাল কোনো যোগাযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

এর আগে অবশ্য গত সোমবার ঢাকার মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বৈঠকে অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। প্রশাসনের মধ্যে কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছে বলে বিভিন্ন স্থান থেকে অভিযোগ আসছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও প্রকাশ্য দিবালোকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে।’

‘দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে। দেড় হাজার শহিদ, ৩০ সহস্রাধিক (আন্দোলনকারী) আহত ও পঙ্গুত্ববরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত আমাদের এই প্রিয় নতুন বাংলাদেশকে কোনো ধরনের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র বা কোনো গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যাবে না,’ উল্লেখ করা হয় এতে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন, সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এবং বিশেষ কোনো দলের দিকে ঝুঁকে না পড়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা শতভাগ নিশ্চিত করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতির জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানান হয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত