ঢাকা শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মুছাব্বির হত্যা

আগে থেকে ওৎ পেতে ছিল দুর্বৃত্তরা শনাক্তে ফুটেজ দেখছে পুলিশ

* স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন * অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা * ‘জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন’ মুছাব্বির, বললেন স্ত্রী * হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি ফখরুলের
আগে থেকে ওৎ পেতে ছিল দুর্বৃত্তরা শনাক্তে ফুটেজ দেখছে পুলিশ

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার পর দুই দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, হত্যাকারীরা ঘটনার আগে থেকেই ওই এলাকায় অবস্থান নিয়ে ওতপেতে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পর আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এখন পর্যন্ত দুজন দুর্বৃত্তকে দৌড়ে পালাতে দেখেছে। আরও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ওই দুজনকে শনাক্তে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম বলেন, আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে। পলাতক দুজনকে শনাক্তে কাজ চলছে। নিহত মোসাব্বির ওই এলাকায় থাকতেন না। তিনি থাকতেন অন্য এলাকায়। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি মাঝেমধ্যে তেজতুরী বাজার এলাকায় যেতেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, বুধবার রাতে কাওরানবাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন মুছাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরী বাজারে আহ্সানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে পাকা রাস্তায় পৌঁছালে ওঁতপেতে থাকা অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তাতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। রক্তাক্ত জখম নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে সুফিয়ান বেপারী মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করে হামলাকারীরা। মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসকরা মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করার পর তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে পাঠানো হয়। মাসুদকেও বিআরবি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন : রাজধানীর তেজগাঁওয়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক আয়শা পারভীন। এর আগে মুছাব্বিরের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. হায়দার আলী।

প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার পেটের ডান পাশে আধা ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র ছিল। ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে ছিল আরেকটি ছিদ্র। এ ছাড়া বাঁ পায়ের হাঁটুতে জখম ছিল। আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে জানা গেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে নিহত ব্যক্তির স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা বলতে পারছি না। সিসিটিভি ফুটেজ যেহেতু আছে, আশা করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেগুলো দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। আর এ রকম ঘটনা তো ঘটছে। আগেও ঘটেছে। এখনও ঘটছে। ভবিষ্যতেও ঘটবে। সুষ্ঠু তদন্ত না হলে আমার মতো আরও অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

এদিকে পুলিশ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুইজনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। সেখানে একজনের চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। তিনি বলেন, ‘তাকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যার তদন্তে অনেকটা অগ্রগতি হবে।’ ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে থানা পুলিশ ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশ, র‍্যাব সমন্বয় করে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। মুছাব্বির হত্যার ঘটনার পেছনে কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ীদের উপর হামলার ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ।

গত বছর ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের উপর হামলার অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের এলাকায় আধিপত্যটা কমে গেলে মুছাব্বির সেই জায়গা ‘নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে’ বলে অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে এলাকায় বেশ উত্তেজনা চলছিল।

এছাড়াও ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখল নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলে আসছে। এই গ্যারেজ দখল ঘটনায় মুছাব্বিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে পুলিশ। এসব কারণেই মুছাব্বিরের স্ত্রীর স্বামীর জীবননাশের হুমকির অভিযোগের মিল আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন। তবে এর পাশাপাশি হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

প্রসঙ্গত, আজিজুর রহমান মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম-সম্পাদকও ছিলেন একসময়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে গেছেন। গত বুধবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় স্টার কাবাবের গলিতে গুলিতে নিহত হন আজিজুর রহমান মুছাব্বির। এসময় কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওই রাতে তেজগাঁও থানা পুলিশ জানায়, বসুন্ধরা মার্কেটের পেছনে তেজতুরী বাজার এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা দুজনকে গুলি করে। পরে তাদের উদ্ধার করে প্রথমে বিআরবি হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন।

মোসাব্বিরের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি ফখরুলের : ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মোসাব্বির হত্যায় শোক জানিয়ে বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বার্তায় তিনি এ দাবি জানান। বুধবার রাতে মোসাব্বিরকে দুষ্কৃতকারীরা গুলি করে হত্যা করে। এই অমানবিক ও নৃশংস ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান মির্জা ফখরুল।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতকারীরা আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। দুষ্কৃতকারীদের নির্মম ও পৈশাচিক হামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বির নিহতের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই নির্মম বহিঃপ্রকাশ। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে। তাই এই দুষ্কৃতকারীদের কঠোর হস্তে দমনের বিকল্প নেই।’ ‘গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ দেশের মানুষের জানমাল রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। না হলে ওত পেতে থাকা আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসররা মাথাচাড়া দিয়ে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠবে,’ যোগ করেন মির্জা ফখরুল। মোসাব্বিরকে হত্যাকারী দুষ্কৃতকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব। সেই সঙ্গে তিনি নিহতের রুহের মাগফিরাত কামনাসহ শোকার্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত