
চলমান বিক্ষোভের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরান দেশটির সামরিক ঘাঁটি ও নৌপরিবহনকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলা চালায়, তবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নৌপরিবহন কেন্দ্রগুলো আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে। কালিবাফের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা আরও জোরালো করল। এদিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র হওয়ায় ইরানে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার। তবে আন্দোলন দমনে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। ইরানের ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষায় কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।
গত শনিবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এমন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ওই বিবৃতিতে সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ও ‘শত্রু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো’ ইরানের জননিরাপত্তা দুর্বল করার চেষ্টা করছে। সেনাবাহিনী সর্বাধিনায়কের নেতৃত্বে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পত্তি রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে তীব্র মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে গ্রান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা প্রথম বিক্ষোভ শুরু করে। ধীরে ধীরে এ আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। চলমান আন্দোলন দমন করতে ইরান সরকার গ্রেপ্তার অভিযান ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানে হামলার ব্যাপারে ‘সিরিয়াসলি’ ভাবছেন ট্রাম্প : ইরানে বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে দমন করায় দেশটিতে হামলার ব্যাপারে ‘সিরিয়াসলি’ (গুরুত্বের সঙ্গে) ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস গতকাল রোববার জানিয়েছে, ইরানে কীভাবে হামলা করা যায় এ ব্যাপারে ট্রাম্পকে ব্রিফ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যদিও ট্রাম্প হামলার ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে হামলার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন। সংবাদমাধ্যমটিকে নাম গোপন রাখার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানে কোথায় কীভাবে হামলা চালাতে পারে, সে ব্যাপারে একাধিক পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে বেসামরিক স্থাপনার ওপর হামলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আগে আরেক সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, ট্রাম্প যদি নির্দেশ দেন তাহলে ইরানের সেনাবাহিনীর অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক আকারে বিমান হামলা চালানো হতে পারে।
নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা, হতাহতে ভরে গেছে ইরানের হাসপাতালগুলো : ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। গত বৃহস্পতিবার রাতে সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন হওয়ার পর গত শুক্রবার রাতেও রাস্তায় নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া শনিবারও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। তবে গত শুক্রবার রাতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচার গুলির ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনটি হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলো নিহত ও আহতে মানুষে উপচে পড়েছে। তেহরান হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন তরুণদের মাথা লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি ছোড়া হয়েছে। এছাড়া অনেকের হার্টেও গুলি করা হয়েছে।
একটি চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালে এত বেশি রোগী আসছিল যে তারা ক্রাইসিস মুডে চলে গেছেন। হতাহতের চিকিৎসা দিয়ে তারা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। বিক্ষোভকারীদের পাশপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা ১৪ জন বলে জানা গেছে। লন্ডন থেকে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত দুই হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, নিহত অন্তত ১৯২ : ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া গত দুই সপ্তাহের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া চলমান এই সংঘাতে আহত হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। গতকাল রোববার নরওয়েভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের (আইএইচআর) এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষমতাসীন সরকার ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে টানা দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে অন্তত ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে ইরানে বিক্ষোভে ৫১ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। তবে নতুন হিসাবে সেই সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাইরের শক্তির সমর্থনে বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশের ভেতরে দাঙ্গা চালিয়ে যাচ্ছে অভিযোগে করে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। গতকাল রোববার কয়েকশ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের জাতীয় পুলিশ।
ইরান হিউম্যান রাইটস বলেছে, আমরা বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, কয়েক দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্য যাচাই ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও জনগণের দাবি নিয়ে কথা বলবেন। তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের উপায় ও পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।
দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, জাতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে এক কথোপকথনে প্রেসিডেন্ট ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারে সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও জনগণের দাবির জবাবে সরকারের অবস্থান নিয়েও আলোচনা করেছেন। সাক্ষাৎকারটি রোববার আরও পরে সম্প্রচার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা ইরানের, মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি : ইরানের বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। একই সঙ্গে বিক্ষোভে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, তারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহম্মদ মোভাহেদি আজাদের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিক্ষোভকারীদের ‘মোহারেব’ (আল্লাহর শত্রু) বলে ঘোষণা করছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ‘মোহারেব’-দের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’
ইরানের সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো গোষ্ঠী কিংবা সংগঠন যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে— তাহলে ওই গোষ্ঠীর বা সংগঠনের সব সদস্যকে মোহারেব বা আল্লাহর শত্রু বলে ঘোষণা করে। ইরানের সংবিধানে আল্লাহর শত্রুদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ইরানে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে।
ইরানে ভয়াবহ বিক্ষোভ, উচ্চ সতর্কতা জারি ইসরায়েলে : ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে দেশজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই জারি করা হয়েছে এ সতর্কতা। ইসরায়েলের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মধ্যে টেলিফোনে বৈঠক হয়েছে। মূলত ইরান পরিস্থিতিই ছিল সেই ফোনালাপের একমাত্র বিষয়বস্তু। তবে সরকারি সূত্রের বরাতে নেতানিয়াহু-রুবিওর আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে রুবিওর সঙ্গে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আগের দিন শুক্রবার মার্কিন দৈনিক দ্য ইকোনমিস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে ইরান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘আমার মনে হয় কোনো ধারণাগত মন্তব্য না করে আমাদের উচিত হবে ইরানে কী ঘটছে, তা দেখা। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও তত তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলন বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
ইরানে ফ্লাইট বাতিল করছে একাধিক এয়ারলাইনস : ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, সহিংস দমন-পীড়ন ও সার্বিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার প্রভাবে দেশটির বিভিন্ন শহরে নির্ধারিত একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত শনিবার লুফথানসা, ফ্লাইদুবাই, তুর্কিশ এয়ারলাইন্স, এ-জেট, পেগাসাস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সসহ কয়েকটি বিমানসংস্থা ইরানে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
দুবাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ফ্লাইদুবাইয়ের তেহরান, শিরাজ, বান্দার আব্বাস এবং মাশহাদের উদ্দেশে নির্ধারিত অন্তত ১৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করে বিমানসংস্থাটির এক মুখপাত্র আল-মনিটরকে জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনে ফ্লাইটসূচি সমন্বয় করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দুবাই বিমানবন্দরের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম বিমানসংস্থা এমিরেটসের তেহরানগামী ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
তুরস্কের জাতীয় বিমানসংস্থা তুর্কিশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে শনিবার (১০ জানুয়ারি) তেহরান, তাবরিজ ও মাশহাদগামী ১৭টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। তুর্কিশ আরেকটি এয়ারলাইন এ-জেটও তেহরানগামী ছয়টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
ইরানে অস্থিরতা উসকে দিতে ইসরায়েলের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক : ইরানে অস্থিরতা উসকে দিতে ও পুনরায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসাতে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে দখলদার দেশটি থেকে পরিচালিত একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত অনলাইন ক্যাম্পেইনের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছর ইসরায়েলের বিমান হামলার সময় তেহরানের এভিন কারাগার ঘিরে পারস্য ভাষায় ডিপফেক ভিডিও ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়। একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য মার্কার ও হারেৎজের যৌথ তদন্তে জানা গেছে, এসব পারস্য ভাষার অনলাইন প্রচারণা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে।
২০২৩ সালের শুরুতে রেজা পাহলভি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক সফরে ইসরায়েল যান। তিনি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে তার বাবা ক্ষমতাচ্যুত হন ও ইরানে আয়াতুল্লাহদের নেতৃত্বে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসরায়েলের তৎকালীন গোয়েন্দামন্ত্রী ও বর্তমান বিজ্ঞানমন্ত্রী গিলা গামলিয়েল তাকে ‘ইরানের যুবরাজ’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এই সফরটি হারেৎজসহ ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনে সরকারি বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলা হয়, ইসরায়েল ও ইরানের জনগণের মধ্যে শত্রুতা নেই; বিরোধ কেবল ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর।
ইরানি প্রবাসীদের একটি অংশের মধ্যে রেজা পাহলভির কিছু জনপ্রিয়তা থাকলেও, ইরানের ভেতরে জনগণ তাকে নেতা হিসেবে চায় কি না, তা স্পষ্ট নয়। তিনি এমন একজন সাবেক স্বৈরশাসকের পুত্র, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থন পেয়েছিলেন। তার বাবার শাসনামল পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি উন্মুক্ত হলেও দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও বিরোধীদের ওপর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিল।
বাবার বিপরীতে রেজা পাহলভি শান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলেন। গিলা গামলিয়েলের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ইরানি জনগণ কীভাবে আয়াতুল্লাহদের শাসন থেকে মুক্তি পাবে। উত্তরে তিনি সাবলীল ইংরেজিতে বলেন, লেহ ওয়ালেসার পোল্যান্ড থেকে নেলসন ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকা, বহু সফল আন্দোলনই অহিংস গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে, বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এরপর তিনি বক্তব্য সংশোধন করে যোগ করেন, এসব আন্দোলন আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া সফল হতো না, এ যুক্তিতেই তিনি ইসরায়েল সফরের ব্যাখ্যা দেন।
পাহলভির ভূমিকা : ১৯৭৯ সালের শাহবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রেজা পাহলভির পরিবার তেহরান ছাড়তে বাধ্য হয়। নির্বাসনে থাকা অবস্থায় কায়রোতে তার বাবার মৃত্যু হয়, তখন পাহলভির বয়স ছিল ২০ এর কোঠায়। রাজতন্ত্রপন্থিরা তখন তাকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন।
৪৫ বছর ধরে তিনি বিদেশে বসে আয়াতুল্লাহদের শাসনের সমালোচনা করে আসছেন। ইসরায়েল ধীরে ধীরে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টার অংশ বলে মনে করা হয়। গিলা গামলিয়েলই নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার বৈঠক আয়োজন করেন। তেল-আবিবভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক রাজ জিম্মত বলেন, অধিকাংশ ইরানি পরিবর্তন চাইলেও, তারা রাজতন্ত্র ফেরাতে আগ্রহী নন। তার মতে, পাহলভি ইরানিদের প্রথম পছন্দ নন, কারণ তিনি ১৯৭০-এর দশকের পর আর কখনো ইরানে পা রাখেননি।
জিম্মত আরও বলেন, ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থন খামেনির সেই বয়ানকে শক্তিশালী করে, যেখানে বলা হয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আবার রাজতন্ত্র ও ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। তার মতে, এটি কূটনীতির চেয়ে বেশি জনসংযোগমূলক উদ্যোগ।
এভিন কারাগার ও ‘প্রিজন ব্রেক’ : সিটিজেন ল্যাবের নতুন প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দু এভিন কারাগারে ইসরায়েলি হামলার সময় অনলাইনে চালানো একটি সমন্বিত প্রচারণা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রিজন ব্রেক’। গত ২৩ জুন সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে হামলা শুরু হয় ও প্রায় এক ঘণ্টা চলে। ইরানি গণমাধ্যমে খবর আসার আগেই, ১১টা ৫২ মিনিটে ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো ‘কারাগার এলাকায় বিস্ফোরণ’ হওয়ার দাবি করে পোস্ট দেয়। কয়েক মিনিট পর একটি ভিডিও ছড়ানো হয়, যা পরে নিউইয়র্ক টাইমস তদন্তে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ততক্ষণে বিশ্বজুড়ে বহু গণমাধ্যম সেটি প্রচার করে ফেলেছিল। সিটিজেন ল্যাবের মতে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। হামলার পর ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো ইরানের সাধারণ মানুষকে কারাগারে গিয়ে বন্দিদের মুক্ত করার আহ্বান জানায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ‘তেহরান অরক্ষিত’ এ ধরনের বার্তা ছড়ানো হয় ও মানুষকে ব্যাংক লুটের মতো উসকানিমূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।