ঢাকা বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভারতে খেলতে যাবে না বাংলাদেশ

ভারতে খেলতে যাবে না বাংলাদেশ

আইসিসির অনুরোধ সত্ত্বেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে না যাওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে গিয়ে না খেলার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) আবারও জানিয়ে দিয়েছে বোর্ড। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশে আয়োজনের জন্য আইসিসিকে আবার অনুরোধ করা হয়েছে বিসিবির পক্ষ থেকে। গতকাল মঙ্গলবার বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের পর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। সম্ভাব্য ভেন্যু কিংবা গ্রুপ পরিবর্তন নিয়ে সম্ভাবনার আলোচনা উঠেছে ক্রীড়াঙ্গনে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় বিসিবির পক্ষে সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন ও ফারুক আহমেদ, ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নাজমূল আবেদীন এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরী অংশ নেন। বিসিবির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে দল না পাঠানোর ব্যাপারে বোর্ড আগের সিদ্ধান্তেই অটল আছে। আইসিসি অবশ্য সভায় বিসিবিকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপের সূচি এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিসিবি তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনেনি। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব আইসিসিকে পুনরায় দিয়েছে বিসিবি। বিসিবি জানিয়েছে, ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ ও অফিশিয়ালদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকেই তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আইসিসি ও বিসিবি আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান খুঁজতে সম্মত হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ বাংলাদেশের ভারত বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার ইস্যুতে ‘তিনটি আশঙ্কা’র কথা জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল। সেই চিঠির বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের ঝুঁকি পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে ডিসেম্বরে এবং পুরো আসর ঘিরে ঝুঁকির মাত্রা ‘মডারেট’ বা মাঝারি মাত্রার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকির মাত্রা ‘মডারেট টু হাই’ বা মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার বলে জানানো হয়েছে বিসিবিকে পাঠানো অভ্যন্তরীণ মেইলে। এ ছাড়া ভারতে বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশের সমর্থকদের নিরাপত্তা ইস্যু এবং বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক টানাপড়নের রেশও উল্লেখ রয়েছে।

বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলের ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে দুটি পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের দর্শক-সমর্থকরা বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ঘোরাফেরা করলে সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতে ততই উত্তেজনা বাড়বে এবং ভারতে থাকলে এর আঁচ লাগতে পারে বাংলাদেশ দলের গায়েও। রিপোর্টে যেমন এসব ঝুঁকি মাথায় নিয়েও বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে যেতে বলা হয়নি, আবার এটাও বলা হয়নি যে যাওয়াটা ঠিক হবে না। পরিস্থিতির আলোকে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা এই রিপোর্টে বলা হয় না। সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বোর্ডের।

তবে এ ধরনের ঝুঁকি যেখানে আছে, সেখানে বাংলাদেশ দলের খেলতে না যাওয়াটাই যুক্তিসংগত। গত সোমবার যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘আইসিসির সিকিউরিটি টিমের এই বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে ভারতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার কোনো রকম পরিস্থিতি নেই।’

বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টটি যারা তৈরি করেছে, তারা আইসিসির নিয়োগ করা একটি স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষক দল। এ রকম নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলে আইসিসির নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্বাগতিক দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরাও থাকেন। অনেক সময় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও এতে ভূমিকা রাখে।

আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের চিঠিকে উদ্ধৃত করে যে তিনটি পরিস্থিতিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে ক্রীড়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, সেসব বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থারও শঙ্কা থাকাটা তাই অস্বাভাবিক নয়।

আইসিসি ভারতের স্বার্থে কাজ করছে- সাঈদ আজমল : বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ভারতের স্বার্থে কাজ করছে- এমন বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন পাকিস্তানের সাবেক তারকা স্পিনার সাঈদ আজমল। করাচিতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইসিসির নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সাঈদ আজমল বলেন, আইসিসি যদি সত্যিই বিশ্ব ক্রিকেটের অভিভাবক হতো, তাহলে সব দেশের জন্য একই নিয়ম কার্যকর করত। বাস্তবতা হলো, আইসিসি এখন ভারতের হয়ে কাজ করছে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সম্পর্কের উদাহরণ টেনে তিনি আইসিসির ভূমিকার সমালোচনা করেন। তার মতে, পাকিস্তানে কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজন হলে ভারত সেখানে খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, অথচ আইসিসি সেটি মেনে নেয়। এতে স্পষ্ট হয় যে সংস্থাটি শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ।

সাঈদ আজমলের ভাষায়, ভারতের পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তারপরও আইসিসি কিছু বলতে পারে না। কারণ তারা ভারতীয় বোর্ডের প্রভাবের বাইরে যেতে পারে না। তিনি আরও বলেন, যদি আইসিসি নীতিগত ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে তাদের কার্যক্রম ও অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বিশ্ব ক্রিকেটের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষায় সংস্থাটির স্বাধীন ভূমিকা থাকা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও উঠে আসে। সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার কামরান আকমল ভারতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে বাংলাদেশের দ্বিধা এবং মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা বিতর্ক প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। কামরান আকমল বলেন, যেখানে একজন ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে পুরো একটি দলকে কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে- এই প্রশ্নটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশ তাদের জায়গা থেকে সঠিক চিন্তাই করছে।

সাঈদ আজমল ও কামরান আকমলের মন্তব্যে বিশ্ব ক্রিকেটে ক্ষমতার ভারসাম্য, আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এখন ক্রিকেট বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে একটাই প্রশ্ন- আইসিসি কি সত্যিই সব দেশের জন্য সমান, নাকি প্রভাবশালী বোর্ডগুলোর স্বার্থই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে?

প্রসঙ্গত, কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয় বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে। বিসিসিআই কিংবা আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি যদিও এর নেপথ্য কারণ উল্লেখ করেনি। তবে বাংলাদেশ মনে করছে মুস্তাফিজকে নিয়ে ক্রমাগত ক্ষোভ বাড়তে থাকায় এমন পদক্ষেপ। ফলে পুরো বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। ৭ ফেব্রুয়ারি পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের, পূর্বনির্ধারিত সূচিতে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের তিন ম্যাচ কলকাতা এবং আরেকটি মুম্বাইয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত