
ক্ষমতায় গেলে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বস্তিবাসীর পুনর্বাসনসহ নানা সামাজিক সমস্যা সমাধানে বিএনপি কাজ করবে বলে জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ভাষানটেকে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় এসব প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, দেশে দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। এখন সময় দেশ গঠনের। স্বৈরাচারী শাসনের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, আমি, তুমি ও ডামির নির্বাচন যখন হয়েছিল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যা নিয়ে জনপ্রতিনিধির কাছে যেতে পারেনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
জনসভায় উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, তিনি জনগণের মুখ থেকেই তাদের সমস্যার কথা জানতে চান। তার প্রত্যাশা, আগামী দিনে প্রতিটি জনপ্রতিনিধি জনগণের কাছে যাবেন, তাদের কথা শুনবেন এবং সমস্যার সমাধানে কাজ করবেন। নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড চালু করা হবে এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে কৃষির উন্নয়নে কাজ করবে বিএনপি। পাশাপাশি যুবকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে, যাতে তারা দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, বিদেশে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারে কিংবা নিজ উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে।
নারীদের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ক্ষমতায় গেলে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিএনপি কাজ করবে। এ ছাড়া বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ’-এই শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ধানের শীষ প্রতীক যতবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে, ততবারই মানুষের জীবনে উন্নতি এসেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সারা দেশে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে হবে। এ জন্য সবাইকে নিজের আত্মীয়স্বজনকেও ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জুবায়ইদা রহমান। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, ফরহাদ হালিম ডোনার ও নাজিমুদ্দিন আলম। দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বের মধ্যে উপস্থিত আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক এবং সদস্যসচিব মোস্তফা জামান।
স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে রয়েছেন ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক কাদের মাহমুদ। পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মেদ জনসভায় অংশ নেন। এর আগে বক্তব্য শুরুর আগে ভাষানটেকের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি ভ্যানচালক, গৃহিণী, বস্তিবাসী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এলাকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এবং নির্বাচিত হলে ও ক্ষমতায় গেলে সেসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।
মুনাফেকদের হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে- তারেক রহমান : বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, কয়েকদিন আগে দেশে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প হয়েছে। মুনাফেকি, ধোঁকাবাজির জন্য আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন। শিরককারীদের, মুনাফেকদের ও ধোঁকাবাজদের হাত থেকে এই দেশকে ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। যারা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে একমাত্র তারাই মানুষদের রক্ষা করতে পারবে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর বাসাইল এলাকায় পৌর পার্ক-সংলগ্ন এলাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা উপলক্ষে নরসিংদী জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বলেন। তারেক রহমান বলেন, এই দেশটাকে তো নতুন করে গড়তে হবে। একজন তো দিল্লি বাইগা গেছে, আরেকজন তো কিছু হলেই পিন্ডি চলে যায়। খালেদা জিয়া কোথাও গেছে? তিনি সবসময় বলেছেন, এই দেশের মাটিই আমার ঠিকানা। আমি কোথাও যাব না। তাই এই দেশকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের ছাত্র-জনতা, নারী, শ্রমিক, পেশাজীবী সব ধরনের মানুষ এই দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছিল। যেই স্বাধীনতা আমরা ৭১ সালে অর্জন করেছি। আপনার কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার, তারা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে ফিরিয়ে এনেছে। তাই কথা বলতে হবে। যেটা ভালো সেটাকে ভালো বলতে হবে। আর যেটা মন্দ সেটাকে মন্দ বলতে হবে। যদি মন্দ হয় সেটাকে প্রতিবাদ করতে হবে। গত ১৫ বছর তথাকথিত নির্বাচনে কি কোনো জনসভা করতে দিয়েছিল? ভোটের অধিকার দিয়েছিল? শুধু ছিল গুম, শুধু ছিল খুন, শুধু ছিল গায়েবি মামলা। আর ছিল বিদেশে টাকা পাচার। সেজন্যই তো আজকে রাস্তাঘাটের অবস্থা এই রকম খারাপ। স্কুল-কলেজ, হাসপাতালগুলোর অবস্থা জীর্ণ হয়ে গেছে। বেকার যারা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। আমরা বলি ‘করবো কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। আগামী নির্বাচনে ধানের শীষ জিতলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাই সবার আগে আপনাদেরকে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি নরসিংদীর পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। তারেক রহমানের নরসিংদীতে আগমন উপলক্ষ্যে বিকাল থেকেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মী সমর্থকরা সভাস্থলে যোগ দেন। রাত যত বাড়তে থাকে নেতাকর্মীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারেক রহমানের বক্তব্য শোনার জন্য নেতাকর্মীরা গভীর রাত পর্যন্ত অধির আগ্রহে অপেক্ষা করেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, জেলা বিএনপির সভাপতি ও নরসিংদী-১ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খায়রুল কবির খোকনের সভাপতিত্বে ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনজুর এলাহীর সঞ্চালনায় জনসভায় বক্তৃতা দেন নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাব) নরসিংদী জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহসম্পাদক মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল, বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সহস্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আবদুল কাদির ভূইয়া জুয়েল, সদস্য আকরামুল হাসান মিন্টু, যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ হোসেন, যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম প্রমুখ
জনগণের মূল কাজ সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচন করা- তারেক রহমান : বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশকে নিরাপদ করতে হলে, ভোটের অধিকার ও কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের মূল কাজ হচ্ছে সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচন করা। গত বৃহস্পতিবার ভোর রাতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার রূপগঞ্জের গাউসিয়ায় প্রচারণার প্রথম দিনের শেষ নির্বাচনি সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, বিগত ১৫ বছরে এমন কোনো নির্বাচনি জনসভা হয়নি। বিগত ১৫ বছরে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হলে, রাষ্ট্রকে মেরামত করতে হলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এই দেশে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। আগামীতেও আমরা সবাই মিলে শান্তিতে থাকতে চাই। তিনি বলেন, দেশকে নিরাপদ করতে হলে, ভোটের অধিকার ও কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে, মা-বোনদের স্বাবলম্বী করতে হলে এবং কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াতে হলে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আপনারা কষ্ট করে কেন অপেক্ষা করছেন? ভোররাতে জেগে থাকা আপনাদের সবার মুখে একটি চাওয়া ফুটে উঠেছে। কী সেটা? বাংলাদেশের মানুষ একটি পরিবর্তন চায়। তারা চায় একটি নিরাপদ দেশ, যেখানে সবাই নিরাপদে থাকতে পারবে, নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে, রাস্তাঘাটে নিরাপদে চলতে পারবে।
কাল চার জেলায় নির্বাচনি জনসভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের তৃতীয় দিনের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকাল থেকে দিনব্যাপী চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। গতকাল শুক্রবার বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সূচি অনুযায়ী, আগামী রোববার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল রেডিসনে আয়োজিত একটি ‘পলিসি ডায়ালগ’-এ অংশ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এতে দলের নীতিনির্ধারণী দিক, নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর পর বেলা ১১টায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড ময়দানে একটি জনসমাবেশে বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান।
এই সমাবেশকে ঘিরে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের জেলা থেকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। চট্টগ্রামের কর্মসূচি শেষে তিনি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে ফেনী পাইলট কলেজ মাঠে আরেকটি জনসমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে কুমিল্লার তিনটি স্থানে পর্যায়ক্রমে জনসমাবেশে অংশ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এ সব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে চৌদ্দগ্রাম, সুয়াগাজী ও দাউদকান্দি এলাকায়। দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বালুর মাঠে একটি সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। ওই সমাবেশ শেষে তিনি ঢাকার গুলশানে নিজ বাসভবনের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। দলীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরাই বিএনপির মূল লক্ষ্য।