
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১৭ দিন বাকি। এই সময়ে মাঠপর্যায়ে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। বিশেষ করে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিনই অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি সড়ক ও মহাসড়কে চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিনই অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী, চিহ্নিত অপরাধী ও সন্দেহভাজনদের ধরতে চলছে বিশেষ তল্লাশি অভিযান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সেজন্য কঠোর নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বৃহস্পতিবার আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন প্রস্তুতি ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ব্রিফিংয়ে জানান, নির্বাচনে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি- এই দুই দিকই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। নির্বাচন সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি রিভিউ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান; জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান; প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ। এ ছাড়া তিন বাহিনী প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব, আনসার ও কোস্ট গার্ডসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা প্রস্তুতি প্রসঙ্গে প্রেস সচিব জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৩০০টি আসনে ৩০০টি নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে চার দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পর দুই দিন- মোট আট দিনের জন্য ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ন্যূনতম ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে এই সংখ্যা ১৫ থেকে ১৭ জন এবং গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ থেকে ১৯ জন পর্যন্ত হতে পারে। প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া পুলিশ, আনসার, ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হবে। কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দ্রুত সাড়া দেবে। এবার প্রথমবারের মতো এক লাখের বেশি সেনাসদস্য, পাঁচ হাজারের বেশি নৌবাহিনী সদস্য এবং তিন হাজার ৭৩০ জনের বেশি বিমানবাহিনী সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাব, ফায়ার সার্ভিসসহ বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন উদ্যোগ হিসেবে প্রায় ৪১৮টি ড্রোন ও ৫০টি ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থাকবেন প্রায় ৯ লাখ সদস্য- স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা : গত ১৯ জানুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভা শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে ১ লাখ সেনাসদস্য, ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৭৩০ জন বিমানবাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্ট গার্ড সদস্য, ৭ হাজার ৭০০ জন র্যাব সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য মোতায়েন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনা- সবকিছুর সমন্বয় থাকবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে। ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৬১। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ কেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। তিনি আরও বলেন, অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে ২৫ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় থাকবে ডগ স্কোয়াড। সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচনের চার দিন আগে থেকেই বিভিন্ন বাহিনী নিবিড় টহল দেবে এবং চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় সমন্বিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
নির্বাচনে নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ আইজিপির গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইন্সের সিভিক সেন্টারে পুলিশ অফিসার ও ফোর্স সদস্যদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক প্রাক-নির্বাচনি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সব পুলিশ সদস্যকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা, ধৈর্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়।
সভায় আইজিপি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় সর্বদা নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। জনবান্ধব পুলিশিং আরও শক্তিশালী করতে জনগণের দোরগোড়ায় সহজ ও কার্যকর পুলিশি সেবা পৌঁছে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
বাড়ছে গোয়েন্দা নজরদারি : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-কে নজরদারি বাড়ানো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে বিশেষ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, পুলিশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, আনসার ও ভিডিপি এবং বিজিবি মাঠে সক্রিয় ভূমিকায় থাকছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও স্থাপনা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এই অস্ত্রগুলো টার্গেট কিলিং বা বড় ধরনের নাশকতায় ব্যবহার হতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিতে দ্রুত এসব অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরি।