
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ১২ তারিখ দুইটা ভোট। একটা হচ্ছে গণভোট। গণভোটে কী বলবেন? গণভোটে হ্যাঁ মানেই হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ। হ্যাঁ মানে পুরোনো রাজনীতিকে লাল কার্ড। যেই রাজনীতি মানুষ খুন করে, যেই রাজনীতি আয়নাঘর তৈরি করে, যে রাজনীতি দেশপ্রেমিক নেতাদেরকে খুন করে, যেই রাজনীতি আমার দেশের সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠন করে ১২ তারিখ সেই রাজনীতিকে ইনশাআল্লাহ লাল কার্ড। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহীর মাদরাসা মাঠে নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতের আমির বলেন, এক ভাই বলেছেন রাজশাহীতে কোনো উন্নয়ন হয় নাই, না উন্নয়ন হয়েছে। দুই ধরনের- একটা হলো কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি তারপর সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট এগুলোর কিছু উন্নয়ন হয়েছে। আবার ৫৪ বৎসরে উন্নয়ন হয়েছে দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির। মানুষের হক নষ্ট করার ঠিকই উন্নয়ন হয়েছে, ব্যাংক ডাকাতি করার উন্নয়ন হয়েছে, শেয়ার মার্কেট লুট করার উন্নয়ন হয়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরকে পথে বসানোর উন্নয়ন হয়েছে। নিজেদের কপাল কিসমত গড়ে বাংলাদেশের টাকা বিদেশে পাচার করার এই দুই ধরনের উন্নয়ন সারাদেশে হয়েছে। এখানেও হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা চাই জনগণের উন্নয়ন, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যেকটি নারী পুরুষের উন্নয়ন। আমরা চাই সেই দেশ যেখানে শান্তিতে আমরা বসবাস করতে পারবো। আমরা ওই দেশটি চাই যেখানে আমাদের শিশুরা পুষ্টি পেয়ে বড় হবে, সুস্বাস্থ্যের সাথে আর শিক্ষা পেয়ে হবে সুনাগরিক। আমরা সেই দেশটি চাই। শিক্ষার পরে মর্যাদার একটা কাজ পাবে ওই দেশটা চাই। আমার মা, আমার স্ত্রী, আমার বোন, আমার মেয়ে, তারা পাবে নিরাপত্তা এবং মর্যাদা পাবে। আল্লাহর দেওয়া সমস্ত অধিকার তারা এখানে নিঃসংকোচে ভোগ করবে। আল্লাহ ছাড়া কাউকে তারা পরোয়া করার প্রয়োজন অনুভব করবে না।
জামায়াতের আমির বলেন, আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার কোথাও ন্যায়বিচার কখনো কায়েম হয়নি, হওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির খালেক। আমরা বাকিরা সব মাখলুক। আল্লাহ তায়ালা জানেন তার কোনো সৃষ্টির কোথায় কী প্রয়োজন, কী দুর্বলতা, কী তার পটেনশিয়াল রয়েছে, এটা আল্লাহর চাইতে কেউ বেশি বুঝে না। সেই আল্লাহ মানবজাতির অভিভাবক-রব, তিনি যে বিধান দিয়েছেন এটা দুনিয়ার সর্বোত্তম বিধান। এ বিধান কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এই বিধান কি শুধু মুসলমানের জন্য, আমি বলব না, বলবেন এই বিধান কি শুধু মানুষের জন্য, আমি বলব না, এই বিধান সমস্ত মানবজাতির জন্য। আল্লাহর বিধান কারও ওপর জুলুম কখনো করতে পারে না। জুলুম করার প্রশ্নই ওঠে না। এদেশে আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নারী, পুরুষ, দেশে বহু নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী আছে। সাঁওতাল ভাইবোনেরা আছে। সবাইকে নিয়েই আমাদের বাংলাদেশ। এজন্য আমাদের ১১ দলের স্লোগান হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আমরা আর বিভক্ত করে জাতিতে জাতিতে মানুষে মানুষে আর হিংসা এবং বিদ্বেষ জাগিয়ে রাখতে কাউকে দেব না। তিনি আরও বলেন, আমরা আল্লাহর দরবারে ওয়াদাবদ্ধ, জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ। জনগণের রায়ের মাধ্যমে, ভোটের মাধ্যমে, ভালোবাসা সমর্থনের মাধ্যমে, আল্লাহ যদি এই দেশ পরিচালনার সুযোগ আমাদেরকে দেন, আমরা ইনশাআল্লাহ কাউকে আর চাঁদাবাজি করতে দেব না। ইনশাআল্লাহ এই দেশে কারো দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই দেশে রাজার ছেলে রাজা হবে। বংশ-পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি এই দেশে আর চলবে না। এই দেশে রাজনীতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। রাজনীতি হবে দেশপ্রেমের প্রমাণের মাধ্যমে। এদেশে কোনো আধিপত্যবাদী রাজনীতি আর চলবে না। আমাদের প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকবে। সেই সম্পর্ক হবে সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই।
বিভিন্ন দল ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে ক্ষমতায়িত করেনি : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের ৫৪ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে বারবার সুযোগ পেয়ে নিজেরাই ক্ষমতাবান হয়েছে, জনগণকে ক্ষমতায়িত করেনি। তারা শুধু কোটি কেটি টাকা লুট করেছে। মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি করেছে। ইতোপূর্বে যারা ক্ষমতায় ছিল, জনগণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যাদের তাড়িয়েছেন। তারা ২৮ লাখ কেটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে দেশে কোনও দুর্নীতি হতে দেবো না।’ বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টায় নওগাঁ এটিম মাঠে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বা কোনও গোষ্ঠী অথবা কোনও বিশেষ শ্রেণির মানুষের বিজয় চাই না। আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আর ১৮ কোটি মানুষের বিজয় নিশ্চিত করতে হলে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিতে হবে। ‘যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২৪-এ গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমেছিল, রক্ত দিয়েছিল- তাদের সে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তাদের সে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে প্রকৃত গণতন্ত্র মানুষের মুক্তি আসবে না।’ সম্প্রতি এক্স অ্যাকাউন্টে (সাবেক টুইটার) নারীদের নিয়ে তার ভাইরাল বক্তব্য নিয়ে তিনি বলেন, পাঁচ দিন ধরে আমার ওপর মিসাইল মারা হচ্ছে। আমার এক্স আইডি হ্যাক করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা করে যারা ফায়দা হাসিল করতে চায়, তারা দেশকে গোলাম বানাতে চায়। তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, পরিবারতন্ত্র বজায় রাখতে চায়। অথচ আমরা একসঙ্গে লড়াই করেছি, তারাই আমাকে মিসাইল মেরেছে। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।’ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বেকার ভাতা দিয়ে জাতিকে পঙ্গু করতে চাই না। যুব সমাজকে পর্যাপ্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। তারা দেশে-বিদেশে কাজ করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।’ জামায়াত আমির আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করলে নওগাঁয় চার লেন সড়ক নির্মাণ, পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের অঙ্গীকার করেন। এ ছাড়াও তিনি নওগাঁকে কৃষিপ্রধান পুরো উত্তরাঞ্চলের কৃষি গবেষণাকেন্দ্রের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আম ও লিচু উৎপাদনের জন্য প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দাবি রাখে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সে দাবি পূরণ করবে।’ এ ছাড়াও তিনি নওগাঁয় ধান ও ফল গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।