ঢাকা রোববার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

মার্কিন রাডারব্যবস্থা ধ্বংস

* মার্কিন রণতরীতে ইরানের বৃহত্তম আঘাত * আমিরাত, ডর্জান, সৌদি, বাহরাইনে হামলা * ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্রের ঝড় * ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহর তীব্র যুদ্ধ * ইরাকজুড়ে ইরান-সমর্থিতদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা * ট্রাম্পের মন্তব্যে ইরানিদের মধ্যে হাস্যরস * মাল্টার পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারে ইরানের হামলা * হামলা না হলে আরবে হামলা নয় : ইরান
মার্কিন রাডারব্যবস্থা ধ্বংস

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ এবং সিএনএন গতকাল শনিবার ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এই রাডার ধ্বংসের তথ্য নিশ্চিত করেছে। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে, জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি এয়ার বেসে অবস্থিত এএন-টিপিওয়াই-টু রাডার এবং এর সহযোগী সরঞ্জামগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। এটি মার্কিন অত্যাধুনিক থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই রাডার ধ্বংস হওয়ায় হাই-অল্টিটিউড সার্ভিলেন্স ব্যবস্থায় একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। থাড সিস্টেম সাধারণত বায়ুমণ্ডলের একদম শেষ সীমানায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম, যা প্যাট্রিয়ট মিসাইলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। সেন্টার অন মিলিটারি অ্যান্ড পলিটিক্যাল পাওয়ারের ডেপুটি ডিরেক্টর রায়ান ব্রোবস্ট বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর এটি ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য। জর্ডানের এই রাডার ছাড়াও কাতারে অবস্থিত প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি এএন-এফপিএস-ওয়ান-থার্টি-টু রাডার এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যোগাযোগ টার্মিনালগুলো ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা ছাতার ‘চোখ’ বা সেন্সরগুলোকে অন্ধ করে দিচ্ছে। খবরে বলা হয়, থাড রাডারটি অকেজো হয়ে পড়ায় এখন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের পুরো দায়ভার প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের ওপর পড়বে। কিন্তু বর্তমানে প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় পিএসি-থ্রি মিসাইলের তীব্র সংকট রয়েছে। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানে দুটি ভয়াবহ ইরানি হামলা হয়েছে। যদিও শুরুতে বলা হয়েছিল হামলাগুলো প্রতিহত করা হয়েছে, তবে এখন রাডার ধ্বংসের খবরটি নিশ্চিত হওয়ায় যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

মার্কিন রণতরীতে ইরানের বৃহত্তম আঘাত : পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি এ খবর দিয়েছে। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক সামরিক উত্তেজনার পর এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রধান নৌ-সম্পদের ওপর ইরানের সবচেয়ে সরাসরি এবং বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেস টিভির তথ্যমতে, ইরান তাদের উন্নত ড্রোন এবং দূরপাল্লার নিভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলা পরিচালনা করে। রণতরীটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠানো হয়। খবরে বলা হয়, ইরানের এই হামলায় আব্রাহাম লিঙ্কন রণতরীটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন থেকে এখনো ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা প্রাণহানি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, তাদের জলসীমার কাছে মার্কিন উস্কানিমূলক উপস্থিতির পাল্টা জবাব হিসেবেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে তেহরান প্রস্তুত।

আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে হামলা : সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল শনিবার বিকালে ওই হামলা চালানো হয়। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হামলায় একটি মার্কিন স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র, সতর্কীকরণ এবং ফায়ার কন্ট্রোল রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুবাই বিমানবন্দরে হামলা : এর আগে গতকাল সকালে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার পর দুবাই বিমানবন্দরের ওপর চক্কর কাটতে দেখা গেছে অনেক ফ্লাইটকে। অনলাইন ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার জানিয়েছে, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে আসা বেশ কিছু ফ্লাইট অবতরণ করতে না পেরে বিমানবন্দরের ওপর আকাশে চক্কর কেটেছে। এর আগে দুবাইতে ইরানি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। দুবাই মিডিয়া অফিস বলেছে, তারা হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। ‘ইন্টারসেপশন’-এর ফলে সেটির ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে দুবাই বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা হামলার খবর অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। গণমাধ্যমগুলো বলছে, হঠাৎ করে মাঝেমধ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে দুবাই। সেখানে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ডর্জান, সৌদি ও বাহরাইনে আবার হামলা : গতকাল শনিবার সকালে জর্ডানের আকাবা শহরেও হামলা চালায় ইরান। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি ইরানি মিসাইল নিক্ষেপ করা হয় দক্ষিণ ইসরায়েলের বিপরীতে অবস্থিত এই শহরে। এদিন সকালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাহরাইনে দ্বিতীয় দফা হামলা চালায় ইরান। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে কাছাকাছি থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। হামলার পর বাহরাইনজুড়ে সাইরেন বাজানো হয়। সৌদি আরব বলেছে, গতকাল সকালে রিয়াদে আঘাত হানার আগে তারা একটি ড্রোনকে প্রতিহত করতে পেরেছে। এর কিছুক্ষণ আগে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে চারটি ড্রোন ও একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে হামলা চালায় ইরান। হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কিছু জানায়নি রিয়াদ। হামলা হয়েছে কাতারেও। শুক্রবার ১০টি ড্রোন দিয়ে সেখানে হামলা হয়। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর জানায়নি কাতার কর্তৃপক্ষ।

ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্রের ঝড় : ইসরায়েলেও হামলা হয়েছে। গতকাল শনিবার তেলআবিব, দক্ষিণ ও মধ্য ইসরায়েলের বৃহত্তর অংশে বিপুল পরিমাণ ইরানি মিসাইলের উপস্থিতির কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল। বিরশেবা এবং গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সেনা অবস্থানকে লক্ষ্য করেও হামলা করেছে ইরান। এরপর জেরুজালেম, নেগেভ, তেলআবিবসহ দক্ষিণ ইসরায়েলের বিশাল অংশে বিপদ সংকেত বাজানো হয়। ইরান থেকে নতুন দফায় বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করছে বলে জানান তারা। সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। ইসরায়েলি মিডিয়া বলছে, নিয়মিত বিরতিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক আসছে। বিস্ফোরণ আর সাইরেনে ঘুম ভাঙছে ইসরায়েলিদের। এরপর আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করছেন তারা। বিপদগ্রস্ত ইসরায়েলিদের কান্না ও আর্তনাদের শব্দও শোনা যাচ্ছে।

‘ইসরায়েলিদের নিরাপত্তায় সরকারের ব্যর্থতা’ : টানা মিসাইল হামলায় ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। ইসরায়েলিদের নিরাপত্তায় সরকারের ব্যর্থতার কথাও বলেছেন তারা। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাইরেন বাজার কারণে কয়েক মিলিয়ন ইসরায়েলি নাগরিক বাঙ্কারে বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময় পর পর ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘক্ষণ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে রাখা এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ইরানের মূল লক্ষ্য। এতে ইরান নিঃসন্দেহে সাফল্য পাচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো সম্ভব হলেও এ পর্যন্ত অন্তত ২০০ শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি ইসরায়েলে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এতে বড়সড় ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পাচ্ছেন ইসরায়েলিরা।

ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহর তীব্র লড়াই : পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকায় হেলিকপ্টারযোগে অনুপ্রবেশ করা ইসরায়েলি কমান্ডো বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের তীব্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এই সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা সিরিয়ার দিক থেকে আসা ইসরায়েলি বাহিনীর চারটি হেলিকপ্টারকে লেবাননের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করে। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর ইসরায়েলি সেনারা বেকা উপত্যকার বালবেক জেলার নবি চিত নামক একটি শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। যখন তারা ওই এলাকার একটি কবরস্থানের কাছে পৌঁছায়, তখন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের একটি দল তাদের বাধা দেয় এবং সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর তা তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইসরায়েলি সেনারা পিছু হটতে শুরু করে এবং তাদের সরিয়ে নিতে তীব্র বিমান হামলা চালানো হয়। হিজবুল্লাহর আরেকটি বিবৃতিতে জানানো হয়, ইসরায়েলি বাহিনী যখন ওই এলাকা থেকে চলে যাচ্ছিল, তখন তাদের লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিজবুল্লাহর শেয়ার করা ফুটেজে আকাশে ব্যাপক গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে।

ইরাকজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : শুক্রবার ইরাকজুড়ে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী বাগদাদ, দক্ষিণাঞ্চলীয় তেল সমৃদ্ধ প্রদেশ বসরা এবং কুর্দিস্তান অঞ্চলের কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এই সিরিজ হামলা চালানো হয়। এএফপি জানিয়েছে, শুক্রবার গভীর রাতে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। এই বিমানবন্দর এলাকায় একটি সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন কূটনৈতিক মিশন অবস্থিত। নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, হামলার পরপরই বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে আবু ঘুরাইব এলাকা থেকে রকেট হামলার খবরও পাওয়া গিয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ বসরার বুর্জেসিয়া তেল কমপ্লেক্সে দুইবার হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কার্যালয় রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, দুটি ড্রোন গুলি করে নামানো হলেও তৃতীয়টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, এই হামলায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান হ্যালিবারটন এবং কেবিআর-এর অফিস ও গুদামে আগুন ধরে যায়।

ট্রাম্পের মন্তব্যে ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে হাস্যরস : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা ইরানকে কোনোভাবেই দুর্বল করতে পারছে না। বরং, দখলদার ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা জোরদার করেছে তেহরান। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যে ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শর্ত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি বলেছেন, ইরানের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার নির্বাচনে তার হস্তক্ষেপ থাকতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব দাবিকে সরাসরি উপহাস করেছেন ইরানি নেতারা। সেন্টার ফর মিডলইস্ট স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলানি আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের দাবিগুলোকে ইরান ‘পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান’ করে তাদের বর্তমান নীতি বজায় রাখার দৃঢ় সংকেত দিচ্ছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের চেষ্টার জবাবে তেহরান স্পষ্ট করেছে, পরবর্তী নেতা নির্বাচনের একমাত্র এখতিয়ার কেবল ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর। আব্বাস আসলানি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব বক্তব্যকে ইরানি কর্মকর্তারা গুরুত্ব দেওয়ার বদলে উপহাস করছেন। গত কয়েক দিনে তেহরানের পক্ষ থেকে যে ধরনের বক্তব্য আসছে, তাতে ইরানের আত্মবিশ্বাসী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই বিশ্লেষণের সারমর্ম হচ্ছে- ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা কোনো চাপে মাথা নত করবে না এবং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কারও হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই পরিচালিত হবে।

মাল্টার পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারে ইরানের হামলা : ইরান উপসাগরে মাল্টার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির নৌবাহিনীর বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালী এলাকায় চলাচল করায় ‘প্রিমা’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজকে ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। গতকাল সকালে এই ঘটনা ঘটে। জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ‘প্রিমা’ একটি তেল ও রাসায়নিকবাহী ট্যাঙ্কার, যা মাল্টার পতাকাবাহী।

ইরানে এক রাতে ২৩০ বোমা-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ : ইরানে রাতভর বোমা হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েল। হামলায় ইসরায়েলের ৮০টির বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এবং মোট ২৩০টি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বরাতে গতকাল শনিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতভর ইরানের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে রাজধানী তেহরানে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল কয়েকটি সামরিক স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে আইআরজিসির একটি সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ অবকাঠামো সংরক্ষণের একটি গুদাম এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও তৈরির একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা। তবে এসব স্থাপনা ঠিক কোথায় অবস্থিত, সে বিষয়ে বিবৃতিতে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

হামলা না হলে আরব দেশগুলোতে পাল্টাহামলা নয়- ইরান : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, প্রতিবেশী আরব দেশগুলো থেকে হামলা না হলে সেখানে আর পাল্টা হামলা চালাবে না তেহরান। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতে এরইমধ্যে চালানো হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। গতকাল শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিবেশী দেশে ইরান হামলা চালিয়েছে, তাদের কাছে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। শুক্রবার অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে- প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আর কোনো হামলা চালানো হবে না এবং সেসব দেশ থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ না হলে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রও ছোড়া হবে না।’ তবে একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না। তার ভাষায়, ‘ইরানি জনগণের আত্মসমর্পণের স্বপ্ন যারা দেখছে, তাদের সেই ইচ্ছা কবরেই নিয়ে যেতে হবে।’

ইরানে স্থল অভিযান চালাতে পারে কুর্দিরা : খাবাত অর্গানাইজেশন অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তানের মহাসচিব বাবাশেখ হোসেইনি বলেছেন, ইরাকে অবস্থান করা ইরানি কুর্দি যোদ্ধাদের ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা খুবই বেশি। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। গতকাল শনিবার এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানায় আলজাজিরা। সংবাদমাধ্যমটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাবাশেখের কাছে প্রশ্ন ছিল, তার যোদ্ধারা কি এরইমধ্যে কোনো স্থল অভিযান শুরু করেছে কিনা। জবাবে বাবাশেখ বলেন, ‘এই মুহূর্তে না। আমরা এখন কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানে জড়িত নই।’ তবে তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছি এবং এখন পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূল হওয়ায় পদক্ষেপ নেওয়ার শক্ত সম্ভাবনা রয়েছে।’ বাবাশেখ বলেন, ‘এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে খুব সম্ভবত আমরা স্থল অভিযান শুরু করার দিকে এগোব।’

তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বৃহস্পতিবার মোতায়েন-পূর্ব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ইউএস নেভাল ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রণতরী এবং এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজ ও এয়ার উইং তাদের কম্পোজিট ইউনিট ট্রেনিং এক্সারসাইজ শেষ করেছে, যা যেকোনো জাতীয় মিশনে যাওয়ার আগে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। ফক্স নিউজ বলছে, এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটি খুব শিগগিরই মোতায়েন করা হবে এবং এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা দেবে। সেখানে সম্প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড অবস্থান করছিল।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত