ঢাকা শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

একজন শত্রুসেনাও জীবিত ফিরবেন না, বলল ইরান

একজন শত্রুসেনাও জীবিত ফিরবেন না, বলল ইরান

টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিমান হামলা চালিয়েও এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের লক্ষ্যগুলো এখনও পূরণ হয়নি। তাই আরাধ্য লক্ষ্য পূরণে এবার ইরানে সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। সম্ভাব্য স্থল অভিযানের হুমকি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। ইরানের সেনাপ্রধান (কমান্ডার-ইন-চিফ) মেজর জেনারেল আমির হাতামি বলেছেন, ‘যদি শত্রুরা স্থল অভিযানের দুঃসাহস দেখায়, তবে একজন শত্রু সৈন্যকেও বেঁচে ফিরতে দেওয়া হবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে কোনো ধরনের স্থল অভিযান চালায়, তবে তা মোকাবিলায় ৭০ লাখ ইরানি নাগরিক অস্ত্র হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত বলে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

স্থল অভিযান হলে কোনো শত্রুসেনাই যেন জীবিত না ফেরে- ইরানি সেনাপ্রধান : যেকোনো হামলার জন্য ইরানি কমান্ডারদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন দেশটির সেনাপ্রধান। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে এই তথ্য জানানো হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার কাছাকাছি রয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তবে একইসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এটি ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি ইরানি কমান্ডারদের যেকোনো হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, আমির হাতামি বলেছেন, প্রতিপক্ষ যদি স্থল অভিযান চালানোর চেষ্টা করে, তাহলে কোনো শত্রুসেনাই যেন জীবিত না ফেরে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ‘অনুতপ্ত’ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালাবে ইরান : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে ইরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেখারচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার জন্য অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। গতকাল শুক্রবার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, ইরানের কৌশল শুধুমাত্র পাল্টা হামলায় সীমাবদ্ধ নয়, তাদের লক্ষ্য আগ্রাসী পক্ষকে এমনভাবে শাস্তি দেওয়া যাতে ভবিষ্যতে তারা পুনরায় হামলার সাহস না করে। যুদ্ধবিরতির পরে পুনরায় হামলা চালানোর পরিস্থিতি তারা চাইছে না; বরং স্থায়ীভাবে হুমকি নির্মূল করাই প্রধান লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে ইরান নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যেগুলো ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করছে। ইরান আরও জানিয়েছে, তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করেছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শেখারচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথ খুলতে মিত্র দেশগুলোর সাহায্য চাইলেও অনেক দেশ এতে সরাসরি অংশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন এবং সম্ভাব্য স্থল অভিযান হুমকি দিচ্ছেন। এর জবাবে ইরান যেকোনো কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি ইরানের : আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত ফার্স নিউজ এজেন্সির একটি টেলিগ্রাম পোস্টের বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধবিমানটি যখন মধ্য ইরানের ওপর দিয়ে উড়ছিল, তখন সেটিকে গুলি করে নামানো হয়। পোস্টে জানানো হয়, যুদ্ধবিমানটি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়েছে। বিমানটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাইলট সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি তাদের একটি টেলিগ্রাম পোস্টে জানিয়েছে, বিধ্বস্ত হওয়ার সময় ‘ভয়াবহ বিস্ফোরণ’ ঘটায় পাইলটের পক্ষে বিমান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইআরজিসির এই দাবির বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার যে দাবি আইআরজিসি করেছিল, তা অস্বীকার করেছিল সেন্টকম।

ইসরায়েলে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান : ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আবারও দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান-এমনটাই দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে নতুন করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী ইরান থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলার পরপরই দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কাজ শুরু করে।

অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা তেল আবিব ও ইলাত অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি এবং সামরিক শিল্প স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সফল হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, এসব হামলায় ইসরায়েলি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই চিঠিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান যুদ্ধনীতি আদৌ দেশটির জনগণের স্বার্থ রক্ষা করছে কি না। চিঠিতে তিনি মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে জানতে চান, চলমান এই সংঘাত থেকে তাদের প্রকৃত কী লাভ হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আধুনিক ইতিহাসে ইরান কখনও আগ্রাসন বা উপনিবেশবাদের পথ অনুসরণ করেনি এবং কোনো যুদ্ধের সূচনা করেনি। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরানকে একটি হুমকি হিসেবে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা মূলত বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতাবানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে। তার অভিযোগ, ইরানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে তিনি আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

কুয়েতের প্রধান তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা, আগুন : কুয়েতের একটি প্রধান তেল শোধনাগার ও রপ্তানি কেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে কুয়েত সিটি থেকে প্রায় ২৮ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত মিনা আল-আহমাদি শোধনাগারে এ হামলার ঘটনা ঘটে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলার ফলে শোধনাগারের কয়েকটি ইউনিটে আগুন ধরে যায়। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, দেশটির আকাশসীমায় ঢুকে পড়া শত্রুভাবাপন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করছে। মুখপাত্র আরও বলেন, দেশের আকাশসীমা রক্ষায় সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাসক্ষেত্রে আগুন, উৎপাদন বন্ধ : সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম প্রধান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ‘হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স’-এ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আকাশপথে আসা একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়লে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। আবুধাবি মিডিয়া অফিস এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি পোস্টে আবুধাবি মিডিয়া অফিস জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গ্যাসক্ষেত্রের সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এ অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় কাজ করছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি আরও বলেছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

দুবাইয়ে ওরাকলের ডেটা সেন্টারে হামলার দাবি আইআরজিসির : দুবাইয়ে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের একটি ডেটা সেন্টারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌ শাখা। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনার প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। তবে ডেটা সেন্টারে হামলার দাবি নাকচ করেছে দুবাই মিডিয়া অফিস। সংস্থাটি জানিয়েছে, আমিরাতের কোনো ডেটা সেন্টারে হামলার খবর সঠিক নয়। এর আগে গত বুধবার বাহরাইনে অবস্থিত আমাজনের একটি ক্লাউড কম্পিউটিং সেন্টারেও হামলা চালানোর দাবি করে আইআরজিসি।

ইয়েমেন থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে : ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইয়েমেন থেকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডের দিকে ছোঁড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার পর ইসরায়েল সতর্কবার্তা জারি করে। সাইরেন বাজানো হয় বেশ কিছু এলাকায়। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর চতুর্থবারের মতো ইসরায়েল লক্ষ্য করে ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হলো। ইয়েমেনের ইরানপন্থি সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে যচ্ছে।

ব্যাপক হামলার পরও ইরানের বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে- মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য : গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনও অক্ষত রয়েছে। এ ছাড়া দেশটির রয়েছে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নের বরাতে তিনটি সূত্র সিএনএনকে এসব তথ্য জানিয়েছে। তারা বলেছে, ইরানের ভাণ্ডারে এখনও হাজার হাজার ড্রোনও মজুত আছে। ইরান সম্পর্কে একটি সূত্র বলেছে, ‘এখনও পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন কিছু লঞ্চারের কথাও বলা হয়েছে, যেগুলো হয়তো হামলার কারণে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে; কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। ফলে এগুলো আপাতত ব্যবহারের অনুপযোগী হলেও সচল রয়েছে। দুটি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ এখনো অটুট আছে। এর অর্থ হলো, তাদের হাতে এখনও হাজার হাজার ড্রোন রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ মিসাইলের এক বড় অংশও অক্ষত আছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান উপকূলে খুব একটা বিমান হামলা না চালানোয় এগুলো রক্ষা পেয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মাধ্যমে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা জনসমক্ষে সামরিক বিজয়ের দাবি করেছেন। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এসব তথ্য ইরানের টিকে থাকা সামরিক শক্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে। গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তাদের অস্ত্র কারখানা ও রকেট লঞ্চারগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এখন খুব অল্পসংখ্যক টিকে আছে।’

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি শান্ত করতে সব প্রচেষ্টা নিতে প্রস্তুত রাশিয়া- পুতিন : রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া ও মিসর উভয় দেশই সমানভাবে উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মস্কো যেকোনো ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির সঙ্গে এক বৈঠকে পুতিন এসব কথা বলেন। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বৈঠকে পুতিন বলেন, ‘আমরা সবাই আশা করি চলমান এ সংকটের দ্রুত সমাধান হবে। আপনারা জানেন, গতকাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। আমি আবার বলছি, পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাতে প্রস্তুত।’

যুদ্ধ থামিয়ে ইরানের এখনই ‘বিজয় ঘোষণা’ করা উচিত- জাভেদ জারিফ : ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ চলমান সংঘাত অবসানে এক চাঞ্চল্যকর শান্তি প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইরানের সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমানে কোনো সরকারি পদে নেই। তবে তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, ইরানের উচিত এখনই ‘বিজয় ঘোষণা করা’ এবং এমন একটি চুক্তিতে আসা যা বর্তমান সংঘাত থামাবে এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধের আশঙ্কা দূর করবে।

জারিফের দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের প্রধান শর্তগুলো হলো

পারমাণবিক কর্মসূচি : ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে অঙ্গীকার করবে। ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের যে মাত্রা (৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ) ঠিক করা হয়েছিল, ইরান তাদের মজুত সেই সীমার নিচে নামিয়ে আনবে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছেন।

আঞ্চলিক কেন্দ্র : চীন ও রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে এ অঞ্চলে একটি অভিন্ন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। ইরান তার সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও সরঞ্জাম সেখানে সরিয়ে নেবে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার : যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরানকে সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

হরমুজ প্রণালী : হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকেও এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।

অনাক্রমণ চুক্তি : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ সই করবে, যেখানে দুই দেশ ভবিষ্যতে একে অপরকে আক্রমণ না করার অঙ্গীকার করবে।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সবুজ সংকেত ছাড়া জারিফ এ নিবন্ধ প্রকাশ করতে পারতেন না। সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে নির্বাচিত করতেও বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তবে এ প্রস্তাবে মার্কিন প্রশাসন কেমন সাড়া দেবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, জারিফ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ভূ-রাজনীতি ও পারমাণবিক বিষয়ে ‘একেবারে মূর্খ’ বলে মন্তব্য করেছেন। অথচ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগেও এ দুজনই ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছিলেন।

হরমুজ প্রণালীতে বিদেশি হস্তক্ষেপ, জাতিসংঘকে ইরানের হুঁশিয়ারি : কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের তোড়জোড় চলছে জাতিসংঘে। তবে এই পদক্ষেপকে ‘উসকানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে তথাকথিত আগ্রাসী শক্তি ও তাদের সমর্থকদের যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ বিদ্যমান সংকট নিরসনে কোনো কাজে আসবে না। বরং এটি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট এই হরমুজ প্রণালী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ভূখণ্ডে আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে ওই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ওই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শত্রুভাবাপন্ন কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।

মার্কিন হামলায় সর্বোচ্চ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, উপসাগরীয় দেশগুলোর ৮ সেতুর তালিকা প্রকাশ করল ইরান : ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর কারাজে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলায় কারাজে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু সেতু আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপরই ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আটটি প্রধান সেতুর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। ‘ইটের বদলে পাটকেল’ জাতীয় প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার ইঙ্গিত হিসেবে সেতুর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ‘হিটলিস্ট’ প্রকাশ করে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার ইরানের উচ্চতম বি১ সেতুতে দুটি হামলার পর কুয়েত, জর্ডান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বেশ কিছু বিখ্যাত সেতু ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই তালিকায় রয়েছে কুয়েতের শেখ জাবের আল-আহমদ আল-সাবাহ সমুদ্র সেতু; সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শেখ জায়েদ সেতু, আল-মাকতা সেতু ও শেখ খলিফা সেতু; সৌদি আরব ও বাহরাইনকে সংযোগকারী কিং ফাহাদ কজওয়ে এবং জর্ডানের কিং হুসেন সেতু, দামিয়া সেতু ও আবদুন সেতু।

ইরানের অবকাঠামোতে আরও হামলার হুমকি ট্রাম্পের : ইরানের অবকাঠামোতে আরও জোরালো হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখনো পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে। ফলে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প তার বক্তব্য আরও কঠোর করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরানে যা অবশিষ্ট আছে, তা ধ্বংস করা আমরা এখনো শুরু করিনি। এরপর লক্ষ্য হবে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। তিনি আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্ব জানে কী করতে হবে এবং তা দ্রুত করতে হবে।

এর আগে তিনি তেহরান ও কারাজের মধ্যে নির্মাণাধীন একটি সেতুতে মার্কিন হামলার ভিডিও প্রকাশ করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ৮ জন নিহত এবং ৯৫ জন আহত হয়েছেন।

এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, অসম্পূর্ণ সেতুসহ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ইরানিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। এদিকে দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশের চোগাদাক এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের একটি গুদামে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যাতে দুটি কনটেইনার ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া, কেশম দ্বীপের বন্দর এলাকা থেকেও ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে, যা হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বকে আরও সামনে এনেছে। অন্যদিকে, ইরান ও তার মিত্ররাও উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখেছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন জানিয়েছে, তাদের মিনা আল-আহমাদি শোধনাগারে ড্রোন হামলায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যদিও এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে, চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা গভীরতর হচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত