ঢাকা শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হামের প্রকোপ, ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু

হামের প্রকোপ, ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু

দেশের সব জেলায় হামের প্রকোপ। হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে আসছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। গত ১৯ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হামের কারণে ৯ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে ৭১১ জন শিশুর শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য ছাড়াও দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাম সন্দেহে ৫ হাজার ৭৯২ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় ৭৭১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে মোট ৩১৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৯৪৭ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। একদিনে শনাক্ত হওয়া এসব রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ জনই ঢাকা বিভাগের। তবে এই সময়ে ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন কোনো হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। এ ছাড়া খুলনা ও সিলেট বিভাগে ৫ জন করে এবং চট্টগ্রামে ৪ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল ও রংপুর বিভাগে ১ জন করে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

হামের লক্ষণ : হামের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে কমপক্ষে ১০-১৪ দিন সময় লাগে। তাই, কার মাধ্যমে এবং কখন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে তা বোঝা কঠিন। হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো, সর্দি, কাশি, তীব্র জ্বর (১০৩-১০৫ক্কঋ), চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং গালের ভেতরে ছোট সাদা দাগ বা কপ্লিক স্পটের আবির্ভাব। এ উপসর্গগুলো সাধারণত ৪-৭ দিন স্থায়ী হয়। হামের সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ হলো ত্বকে লাল ফুসকুড়ি (র‍্যাশ)। র‍্যাশ সাধারণত সংক্রমণের ৭-১৮ দিন পরে শুরু হয়, প্রথমে মুখ ও গলার উপরের অংশে দেখা যায়। এটি প্রায় ৩ দিনের মধ্যে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত হাত ও পা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। র‍্যাশ সাধারণত ৫-৬ দিন স্থায়ী হয়, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। অধিকাংশ হাম আক্রান্ত রোগী রোগের সূচনা থেকে ৭-১০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং শরীরে আজীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় এবং দ্বিতীয়বার হাম দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। হাম ভাইরাস সংক্রমণের পর মানবদেহ মূলত হিমাগ্লুটিনিন (ঐ) প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং এ অ্যান্টিবডিই পরবর্তী সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

৫৬ জেলায় ছড়িয়েছে হাম, ২১ উপজেলা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ : দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৮ মার্চ পর্যন্ত অন্তত ৫৬ জেলায় হাম শনাক্ত হয়েছে। সরকারি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এতে সংক্রামক রোগটির সারা দেশে ব্যাপক আকারে বিস্তারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জনসংখ্যার অনুপাতে সন্দেহভাজন রোগীর হিসেবে কক্সবাজারে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও বরিশাল সিটি করপোরেশন হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশীদ জানান, বুধবার পর্যন্ত ২ হাজার ৩৭৩টি সন্দেহভাজন নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৪৩টি বা প্রায় ৩১ শতাংশ হাম শনাক্ত হয়েছে।

রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। শুক্রবার দুপুরে নিয়মিত হাম ব্রিফিং এ রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ১২ জন। আর ছাড়পাত্র পেয়েছে ১৩ জন। এখন হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৫২ জন রোগী ভর্তি আছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই বছরের শিশুর মৃত্যু : চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২ বছর চার মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে শুক্রবার হাসপাতালে চিকিৎসা ?শুরুর পরপরই মারা যায় সে। এদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ১২ শিশু। মৃত ওই শিশুর নাম মাসুদা খাতুন, সে সদর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুরের মো. নইমুরের মেয়ে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দীন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শিশু মাসুদাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালে আনার পরপরই কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে তারা নিশ্চিত হন, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মাসুদার মৃত্যু হয়েছে। এদিকে হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৪৬ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর গত তিন মাসে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৩৪৯ শিশু। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রাম অঞ্চলের ছড়িয়েছে ভাইরাস জনিত এই রোগ হাম। এর আগে গত তিন মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়।

টাঙ্গাইলে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু : টাঙ্গাইলে গতকাল শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত শিশু টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ধোলোটিয়া গ্রামের সাদ্দামের ছেলে সাফার বয়স এক বছর এক মাস। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক খন্দকার সাদিকুর রহমান বলেন, ভোরে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও হামের চিকিৎসা দিতে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

হামের উপসর্গ নিয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেলে শিশুর মৃত্যু : কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গে ভর্তি আট মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে শিশুটি মারা গেছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম। মৃত আফরান সদর উপজেলার ভাদালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আল আমিনের ছেলে। ২৬ মার্চ হাসপাতালে ভর্তির সময় থেকে শিশুটির অবস্থা শঙ্কটাপন্ন ছিল বলে দাবি চিকিৎসকের।

চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৬ শিশু হাসপাতালে : হামের উপসর্গ থাকা চট্টগ্রামের আরও ১৬ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯ শিশুকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ দেওয়া হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার হাম সন্দেহে ১৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, নতুন করে ভর্তি হওয়া এসব রোগীর সবাই চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার বাসিন্দা। মহানগর এলাকায় উপসর্গ থাকা ৮৭ রোগী ভর্তি রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছি। মহানগর এলাকায় বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে যাতে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শনাক্তকৃত ও সন্দেহভাজনদের নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে।

নীলফামারীতে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি : নীলফামারীতে হামের উপসর্গ নিয়ে ছয় শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। জ্বর, কাশি ও শরীরে র‌্যাশ নিয়ে অসুস্থ হওয়া এ শিশুদের নীলফামারী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশু জিহাদের মা লিজু বেগম বলেন, প্রথম দিকে জ্বর, পাতলা পায়খানা আর সর্দি-কাশি ছিল। এ কারণে আগাম হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু হাসপাতালে আনার পর বিকালের দিকে হঠাৎ করে শরীরে র‌্যাশ ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। জিজ্ঞেস করলে তখনই ডাক্তাররা হামের আশঙ্কার কথা জানান। নীলফামারী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিষেশজ্ঞ ডা. আব্দুল আউয়াল জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের নানা রোগ বালাই দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে ‘হাম’ একটি মারাত্মক ব্যাধি। ৬ শিশুকে হাসপাতালের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তারা হামে আক্রান্ত। তবে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠোনো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পেলে বলা যাবে হাম কি না। এ বিষয়ে ডা. দেবাশীষ বলেন, বর্তমানে শিশুদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকায় নমুনা পাঠানো হয়েছে।

হামের প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব ছুটি বাতিল : শিশুদের হাম রোগের প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অধিদপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার একটি অফিস আদেশও জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়েছে, শিশুদের মধ্যে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় আপদকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা ও হামের ভ্যাকসিন প্রদানের সুবিধার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও অধিদপ্তরাধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বস্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি (অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি) এতদ্বারা স্থগিত/বাতিল করা হলো। এ আদেশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে জারি করা হলো এবং অবিলম্বে কার্যকরী হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত