ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট

ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট

ফের বাজারে সিন্ডিকেট করে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট তৈরি করা হয়েছে। রাজধানীসহ দেশজুড়ে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তেল নিয়ে এমন তেলেসমাতির সুযোগে ক্রেতা পড়েছেন বিপাকে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চাহিদামতো তেল দিচ্ছেন না ডিলাররা। এতে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকটে পড়েছে বাজারে। কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ীদের দাবি, চাহিদার পাঁচভাগের একভাগে নেমেছে সরবরাহ। তেলের দাম বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে দেখছেন ডিলার-বিক্রেতারা। কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি দোকান ঘুরে ভোজ্যতেল পাচ্ছেন ক্রেতারা। তবে চাহিদার কম তেল কিনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দাম আরও বৃদ্ধি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। এদিকে সরবরাহে টান পড়েছে বলে দাবি বিক্রেতাদের। তাদের হিসাব মতে, দৈনিক যে পরিমাণ সয়াবিন পামতেলের চাহিদা, তার ৫ শতাংশের ১ শতাংশ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, কোম্পানিগুলো কমিয়ে দিয়েছে কমিশনও। ফলে দৈনন্দিন বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গেল ঈদের পর থেকেই চাহিদা মতো এই নিত্যপণ্যের সরবরাহ মিল থেকে মিলছে না বলে জানান ডিলাররাও। অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একে আরেক দফা দাম বৃদ্ধির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ঈদের পর থেকে এরই মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পামতেলের দাম বেড়েছে লিটারে ১০ থেকে ২০ টাকা। প্রতি কেজি খোলা তেল লিটার প্রতি ২১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর সরকার নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার ১৯৫ টাকা।

বোতলের চেয়ে খোলা তেলের দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। এতে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধে সরকার হুঁশিয়ার ঘোষণা দিলেও বাজার বাস্তবতায় আমদানিকারকদের হাতে জিম্মি ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামেই। বিক্রেতা রফিক বলেন, ‘এজেন্ট থেকে যে দামে তেল কিনে আনি, অনেক সময় ওই দামেও বিক্রি করতে হয়। তখন ৫ টাকাও লাভ পাওয়া যায় না। আবার দামে ছাড় দিলে অনেক সময় আমাদের লোকসানও হয়।’ রিজভী নামের আরেক বিক্রেতা অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্রেতারা দোকানে এসে তেল চাইলে দিতে পারছি না। যে দোকানে তেল থাকে ক্রেতারা ওই দোকান থেকে সব ধরনের পণ্য কিনছে। তেল না থাকায় আমার দোকান থেকে কোনো পণ্য নিচ্ছে না। এতে আমার বিক্রিও কমে গেছে।’

জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়ানোর জন্য বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে একধরনের সংকট তৈরি করেছেন। তারা প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারের কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দিলেও বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে খোলা তেল। ভোক্তাকে জিম্মি করে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়নের শুরু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এমন তথ্য দিয়ে ক্যাব বলছে, প্রতিবছর এই সময়ে এসে হঠাৎ বাজারে কমে যায় সরবরাহ, তারপরই আসে কোম্পানিগুলো থেকে আসে ক্রেতার পকেট কাটার প্রস্তাব। সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারও বাধ্য হন তাদের দাবি মেনে দাম বাড়াতে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে খোলা সয়াবিন তেলের মূল্য ১৮৫ টাকা এবং বোতলজাত তেলের মূল্য ১৭০ টাকা হলেও বাজারে বোতলজাত তেল ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া খোলা পাম তেল ১৬২ টাকার পরিবর্তে ১৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব অনিয়ম বাজারে তদারকির ঘাটতির প্রমাণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ক্যাবের সভাপতি শফিকুজ্জামান বলেন, ‘কালোবাজারির সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন, সরকারের দায়িত্ব তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। সরকার যেন ব্যবসায়ীদের কথায় না চলে আইনমতো চলে। সরকার ব্যবসায়ীদের পক্ষে অবশ্যই থাকবে, ব্যবসায়ীরাও পরিবেশটা রাখবে। কিন্তু স্বচ্ছ ব্যবসা যাতে করে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

দেশজুড়ে মজুত ১ লাখ ৬৫ হাজার লিটার ভোজ্যতেল জব্দ : সারা দেশে ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুত মোকাবিলায় ২০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। গতকাল শুক্রবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত বৃহস্পতিবার পরিচালিত এই অভিযানে র‌্যাব দেশের বিভিন্ন এলাকায় মজুত করা প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৫ লিটার ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মজুত শনাক্ত করেছে। অভিযানের অংশ হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের থেকে মোট তিন লাখ ৫৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। কৃত্রিম ঘাটতি রোধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে এবং মূল্য কারসাজি রোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিজিবির তৎপরতা : ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সীমান্তসহ সারাদেশে তৎপরতা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধিসহ সার্বিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল শুক্রবার এ তথ্য জানানো হয়। বিজিবির নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৬২ বিজিবি) ও র‌্যাবের একটি যৌথ দল বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলাধীন তারাবো কাজীপাড়া চৌরাস্তায় রাজু ও খোরশেদ নামক দুই ব্যক্তির গুদামে অভিযান চালায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিযানে অবৈধভাবে মজুতকৃত মোট ৯টি ব্যারেলে প্রায় ২ হাজার লিটার খোলা সয়াবিন তেল পাওয়া যায়। স্থানীয় বাজার থেকে খোলা সয়াবিন তেল সংগ্রহ করে অবৈধভাবে মজুত, বোতলজাতকরণ এবং ‘বন্ধন প্লাস’ ও ‘বিসমিল্লাহ’ নামক স্টিকার ব্যবহার করে তা বাজারজাত করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ধরনের প্রতারণামূলক কার্যক্রম জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তা অধিকারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিজিবি স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে টাস্কফোর্স অফিযান পরিচালনা করছে। এতে বলা হয়, বিজিবি ভোজ্য তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত