ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

এখনই কাটছে না জ্বালানি সংকট

* দুই-চার সপ্তাহে জ্বালানি সংকট থেকে বাংলাদেশ রেহাই পাবে না, বললেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা
এখনই কাটছে না জ্বালানি সংকট

জ্বালানি সংকটের কারণে রাজধানী দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকদের দীর্ঘসারি তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, রাত পেরিয়ে গতকাল শুক্রবার সকাল। এল আরেক দুপুর। এই ২২ ঘণ্টা রাজধানীর আসাদ গেটের মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে তেলের অপেক্ষায় ৬৩ বছরের শঙ্কর চন্দ্র দাস। তিনি গাড়িচালকের চাকরি করেন। শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আসাদগেটে শঙ্কর চন্দ্র দাসের সঙ্গে কথা হয়। তিনি গত বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে তিনি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার সামনে অন্তত ৫০০ গাড়ি ছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে সামনে এগোতে এগোতে যখন পাম্পের কাছাকাছি যান, তখন রাত সাড়ে ৩টা বাজে। তখন ফিলিং স্টেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয় তেল শেষ। তেল কখন আসবে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীরা। ততক্ষণে তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন শঙ্কর। তাই পাম্পে তেল আসার অপেক্ষা করতে থাকেন। বাসায় না ফিরে গাড়িতেই রাত কাটান। তার আশা, তেল এলে তিনি তিন থেকে চারজনের পরই পাবেন।

শঙ্কর চন্দ্র দাস বলেন, এ পর্যন্ত লাইনে থাকতে থাকতে খাবারের পেছনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে। নিয়োগকর্তা কয়েকবার ফোন করেছেন। আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘হেরা তো (মালিক) বড়লোক মানুষ। যে যার মতো চইলা যায়গা গাড়িত থেকে নেমে। গরিবানা চাকরি করি। তেল নিতেই হবে।’

মের্সাস তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মো. এরশাদ জানান, তাদের পাম্পে প্রতিদিন সাড়ে ১৩ হাজার লিটার অকটেন আসে। গতকালও (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৫টার সময় তেল এসেছিল। সে তেল রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বিক্রির পর শেষ হয়ে গেছে। আজকেও (শুক্রবার) বিকেল ৫টার পর তেল আসবে। তালুকদার ফিলিং স্টেশনে আরও বেশ কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা গতকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে তেলের জন্য গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষার পরেও তেল নিতে পারেননি। এই পাম্পে দুপুর ১২টার দিকে ২৬৫টি প্রাইভেট কার ও ১০৫টি মোটরসাইকেল দেখা গেছে। এসব যানবাহনের চালকেরা তেলের জন্য অপেক্ষায়। প্রাইভেটকারের লাইন আসাদগেট থেকে ঘুরে সংসদ ভবনের পেছন হয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত পৌঁছে। শুক্রবার বেলা একটার দিকে আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেট কারের চেয়ে মোটরসাইকেলের সারি বেশি দীর্ঘ দেখা যায়। এই পাম্পে তেলের অপেক্ষায় ৪১০টি মোটরসাইকেল লাইনে দাঁড়ানো দেখা যায়। আসাদগেট হয়ে মোহাম্মদপুর সড়ক হয়ে ইকবাল রোড়ের মাঝামাঝি চলে গেছে মোটরসাইকেলের সারি। এই ফিলিং স্টেশনে ৪০৫ নম্বর সিরিয়ালে তেলের জন্য দাঁড়ান সায়েম আহমেদ। তিনি গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত সাড়ে ১০টার সময় তেলের জন্য এই সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। রাত দেড়টার সময় শুনতে পান পাম্পে তেল শেষ। বাধ্য হয়ে তখন মোটরসাইকেলটি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে বাসায় ফিরে যান। শুক্রবার দুপুরে আবার বাসা থেকে মোটরসাইকেলটিকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সাহায্য পাম্পের সিরিয়াল পর্যন্ত আসেন।

সায়েম আহমদ বলেন, ‘গতকালকেও (বৃহস্পতিবার) তেলের জন্য ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে গেছি এই পাম্পে। রাত দেড়টার দিকে ঘোষণা এল তেল শেষ। পরে ভেবেছি অকটেন না পেলে পেট্রল নিব। বলেছে, অকটেনও নাই। শুক্রবার আবার এসেছিলেন।’ তীব্র রোদের কারণে সড়কের একপাশে মোটরসাইকেল রেখে ফুটপাতে, বিভিন্ন স্থানে অপেক্ষা করতে দেখা যায় চালকদের।

দেশে জ্বালানি তেলের সংকট কাটবে কবে : ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত থামলেও বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সংকট সহসাই কাটছে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ৪০ দিনের এই যুদ্ধে থেমে গিয়েছিল বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালী। এই যুদ্ধে শুধু রক্ত ঝরেনি, দিনের পর দিন জাহাজ আটকে থাকায় ভেঙে পড়েছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি। যুদ্ধের অজুহাতে হঠাৎ করে বাংলাদেশেও বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের হাহাকার। ডিপো আর পাম্প মালিকদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাঝে অপেক্ষা শেষ হয় না সাধারণ মানুষের। রাজধানীতে জ্বালানি তেলের জন্য ভোগান্তি নিত্যদিনের। বৃহস্পতিবার আগারগাঁও, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তেলের জন্য পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইনে যানবাহন চালকরা। ভোগান্তি পৌঁছেছে চরম পর্যায়ে। শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেল নিতে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শৃঙ্খলা ফেরাতে অ্যাপসের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পাম্প কর্তৃপক্ষের দাবি, পর্যাপ্ত তেল পাওয়ায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে গ্রাহকের চাপ অনেক বেশি। এদিকে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, প্রতি মাসে জ্বালানি তেলে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যে দফায় দফায় হরমুজ প্রণালী খোলা আর বন্ধ থাকার প্রভাব পড়ছে বিশ্বের বাজারে। যার ভুক্তভোগী বাংলাদেশেও। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি করে তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকলে সংকট বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ড. আনিসুর রহমান জানান, যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কারণে ১৫ দিনের মধ্যে বিভিন্ন জাহাজ রফতানি করা দেশগুলোতে গিয়ে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে আমদানিকারক দেশে ফিরবে। যখন সরবরাহ বাড়বে তখন সংকটটা ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের সংকট হয়েছে। কিন্তু একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। যুদ্ধবিরতি হলে বাংলাদেশের জন্য ভালো দিক। আমাদের নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অনেকগুলো সমস্যায় পড়ে গেছে। তেলের সংকট কেটে গেলে কিছু সমস্যাও দূর হবে।’ তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি হয়েছে কিন্তু জাহাজ চলাচলের আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালী খোলেনি। তাই যুদ্ধবিরতি থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হরমুজ প্রণালীটা। এই পথ খুলতে গেলে যতগুলো যুদ্ধ হচ্ছে সব বন্ধ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুই-চার সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি সংকট থেকে বাংলাদেশ রেহাই পাবে না। যেসব তেল আটকে রয়েছে, সেগুলো যদি চলে আসে তাহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।’

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত