ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই সমঝোতা কার্যকর হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই লেবাননে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও এমন বড় ধরনের সংঘাত চলতে থাকলে শান্তি প্রক্রিয়া যেকোনো সময় ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংকট নিরসনে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবানন আলোচনার টেবিলে বসবে। এদিকে পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে আলোচনায় বসছে।

ভেঙে পড়ার শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি : ইসরায়েল ও লেবানন আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আলোচনায় বসবে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা এ কথা বলেছেন। তবে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু হয়। মার্চের শুরুর দিকে ইরানপন্থি লেবাননের সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েল তখন লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা শুরু করে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গত বুধবার হামলায় তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হওয়া এ হামলা যুদ্ধবিরতিকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অনিশ্চিত, প্রস্তুত পাকিস্তান : পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আজ উচ্চপর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শুরু হবে কি না, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাকে গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘এখনও সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি।’ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার ইরানি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের রাজধানীতে পৌঁছেছে- এমন প্রতিবেদন অস্বীকার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া একটি পোস্টও মুছে ফেলা হয়। তবে পাকিস্তানে প্রস্তুতি এমনভাবে এগোচ্ছে, যাতে মনে হচ্ছে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এ আলোচনা হবেই। ইরানের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি গত বৃহস্পতিবার জানায়, লেবাননে যুদ্ধবিরতি না হলে আলোচনা স্থগিত থাকবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেও বিবিসির টুডে কর্মসূচিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একই কথা বলেন। এটি হতে পারে শক্তি প্রদর্শনের কৌশল, তবে ইরানের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত-নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে ছেড়ে দেবে, নাকি গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলবে? যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর জন্য যে তড়িঘড়ি আলোচনা চলেছিল, এই আলোচনা নিয়েও পরিস্থিতি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গড়াতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে পাকিস্তান সপ্তাহান্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলকে শান্তি আলোচনার জন্য আতিথ্য দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক জানিয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিনিধির তথ্যমতে, ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর রেড জোনের আশপাশের সড়কও বন্ধ রাখা হয়েছে। ওই এলাকায় বহু সরকারি ভবন ও দূতাবাস রয়েছে।

লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে আলোচনায় যোগ দেবে না তেহরান : যতক্ষণ না লেবাননে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ বন্ধ হচ্ছে এবং দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আয়োজিত কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না ইরান। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরুর আগে ইরানের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি একটি অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের আলোচক দল এখনও ইসলামাবাদে পৌঁছায়নি এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাও করেনি। সংস্থাটি দাবি করেছে, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে যে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনায় অংশ নেবে না। এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, ইরানি একটি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যম এই দাবি অস্বীকার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পালনের ওপর নির্ভর করবে, বিশেষ করে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পরও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। তবে তেল আবিব (ইসরায়েল) ও লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবিকে অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে ২ মার্চ থেকে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় লেবাননে ১৭৩৯ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এসব হামলায় সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেই ১০ মিনিটের ১০০ বিমান হামলায় ২৫৪ জন নিহত হবার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টার্ক। একই সঙ্গে এই বর্বর হামলাকে গণহত্যা বলে আখ্যা দিয়েছে রেডক্রস সোসাইটি।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেই শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা- লেবানন : লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেই শুধুমাত্র আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেবে লেবানন। গতকাল শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এই তথ্য জানান তিনি। এদিকে, বৈঠকের দিন ও সময় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা একেবারে নজিরবিহীন নয়, তবে তা খুবই বিরল। সাধারণত দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছিল, যেখানে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দূতরা উভয় পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা পরিচালনা করেছেন।

উল্লেখ্য, ইরানে হামলা বন্ধ করলেও লেবাননে অভিযান চালিয়েই যাচ্ছে ইসরায়েল। ইরান এটাকে ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ বলে দাবি করলেও ইসরায়েল বলছে, লেবানন যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয়।

যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল থমকে আছে : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার মাত্র পাঁচটি জাহাজ এ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা এর আগের দিনের (১১টি) তুলনায় অর্ধেকেরও কম। গত বৃহস্পতিবার পার হয়েছে মাত্র সাতটি জাহাজ। এদিকে ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’-এর হিসাবে, হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় পারস্য উপসাগরে এখনো ৬০০টির বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে ৩২৫টিই তেলবাহী ট্যাংকার।

ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে অধিকার রক্ষায় অটল- মোজতবা খামেনি : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না তেহরান। তবে নিজেদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় তারা অটল থাকবে। গত বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পাঠ করা এক লিখিত বার্তায় তিনি এ কথা বলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর পাঠ করা ওই বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাইনি এবং এখনো চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে কোনো অবস্থাতেই আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে সরে দাঁড়াব না। এ ক্ষেত্রে আমরা সমগ্র ‘প্রতিরোধ জোটকে’ একসঙ্গে বিবেচনা করি।’ তার এই মন্তব্যকে লেবাননের দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহর ব্যাপক সংঘাত চলছে।

মোজতবা খামেনি তার বার্তায় বলেন, যুদ্ধবিরতি থাকলেও জনগণের আন্দোলন থামানো উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘জনগণের রাস্তায় নামা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। জনসমাবেশে আপনাদের কণ্ঠস্বর আলোচনার ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।’ উল্লেখ্য, বাবার ওপর হামলার সময় তিনি নিজেও আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। তবে তার সব বার্তাই লিখিত আকারে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পাঠ করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একপর্যায়ে দাবি করেন, মোজতবা খামেনি হয়তো মারা গেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, তিনি চিকিৎসাধীন আছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন। তার কিছু ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও সেগুলো কবে তোলা হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি।

হরমুজে জাহাজ থেকে টোল আদায় না করতে ইরানকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি : হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ইরান যেন কোনো ধরনের টোল আদায় না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরান তেলবাহী জাহাজগুলো থেকে ফি বা টোল আদায় করছে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘তাদের এমনটা না করাই ভালো। আর যদি তারা এটি করে থাকে, তবে এখনই তা বন্ধ করা উচিত হবে।’ যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে নতুন ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছে ইরান। এর মাধ্যমে কার্যত এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল বসানোর ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় এ পথে চলাচলকারী কিছু জাহাজ থেকে ইরান টোল সংগ্রহ করেছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে আপাতত দিনে ১৫ জাহাজ যেতে পারবে- ইরান : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর শর্ত অনুযায়ী এবার খুলছে হরমুজ প্রণালী। তবে এই জলপথ দিয়ে যেতে হলে কিছু শর্ত ও সতর্কতা মেনে চলতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌপরিবহন যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও জানিয়েছে তেহরান। গত বৃহস্পতিবার ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হলেও অগণিত জাহাজকে এ পথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। আপাতত দিনে ১৫টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে, এর বেশি নয়। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের আগে দিয়ে রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাস-কে একথা জানিয়েছেন ইরানের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

যেসব জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিতে দেওয়া হবে সেগুলোকে ইরানের অনুমতি নিতে হবে এবং বিশেষ প্রটোকল মেনে চলতে হবে। যুদ্ধবিরতির বর্তমান পরিস্থিতিতে আপাতত দিনে ১৫টিরও কম জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পাড়ির অনুমতি দিচ্ছে ইরান। জাহাজ চলাচল ইরানের অনুমতি, কড়া শর্ত এবং নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনেই হচ্ছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর তত্ত্বাবধানে এই নতুন বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। এই জলপথে জাহাজ চলাচল এখন যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরবে না বলে জানিয়েছেন ওই ইরানি কর্মকর্তা। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অশোধিত তেল সরবরাহ হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরোয়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই জলপথ কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তেহরান। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়। হরমুজ খুলে না দিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে পরে গত মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেন। যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান সীমিত পরিসরে বা নিয়ন্ত্রিতভাবে হরমুজ খুলে দেবে বলে আগেই জানিয়েছিল। সেই কথা মতোই তারা হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু শর্ত বা প্রটোকল জারি করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির সময় জাহাজ চলাচল অবশ্যই ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়’ এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতা বিবেচনা সাপেক্ষে হতে হবে। বুধবার ইরানের আইআরজিসি হরমুজ প্রণালির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই মানচিত্র অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলের কাছের ঐতিহ্যবাহী রুট ছেড়ে আরও উত্তর দিকে অর্থাৎ, ইরান উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে চলতে হবে। আইআরজিসি জানিয়েছে, প্রধান ট্রাফিক জোনে বিভিন্ন ধরনের জাহাজ বিধ্বংসী মাইন থাকার সম্ভাবনা থাকায় সব জাহাজকে নতুন এই মানচিত্র অনুসরণ করতে হবে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তেহরান প্রতিটি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এই অর্থ ওমানের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হতে পারে।

অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে এক ডলার করে টোল নেওয়া হতে পারে। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে চায় ইরান।

হরমুজ প্রণালীর ওপর নিখোঁজ যুক্তরাষ্ট্রের ২০ কোটি ডলারের ড্রোন, বিধ্বস্ত নাকি ভূপাতিত : যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নজরদারি ড্রোন এমকিউ-৪সি গতকাল শুক্রবার হরমুজ প্রণালীর আকাশে নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে এটি উড়ন্ত অবস্থায় জরুরি সতর্কবার্তা পাঠায়। ড্রোনটি বিধ্বস্ত হয়েছে নাকি ভূপাতিত করা হয়েছে-এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। খবর এনডিটিভি’র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রোনটি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি এলাকায় প্রায় তিন ঘণ্টা নজরদারি শেষ করে ইতালির নেভাল এয়ার স্টেশন সিগোনেলায় ফেরার পথে ছিল। ওই সময় এটি ‘কোড ৭৭০০’—সাধারণ জরুরি অবস্থার সংকেত- পাঠায় এবং ধীরে ধীরে উচ্চতা হারাতে শুরু করে। এ সময় ড্রোনটি ইরানের দিকেও সামান্য অগ্রসর হয়েছিল বলে জানা গেছে। চালকবিহীন এই বিমান নিখোঁজ হওয়ার আগে দ্রুতগতিতে উচ্চতা হারাচ্ছিল বলে শনাক্ত করা হয়। এরপর থেকেই এর অবস্থান সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাত্র দুই দিন পর এই ঘটনা ঘটল। ওই চুক্তিতে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। এমকিউ-৪সি ট্রাইটন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নজরদারি ড্রোনগুলোর একটি, যার মূল্য ২০ কোটি ডলারেরও বেশি। এটি দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তৃত সমুদ্র এলাকায় কৌশলগত নজরদারি চালাতে সক্ষম এবং প্রায়ই পি-৮এ পসিডন টহল বিমানের সহায়ক ‘আকাশচর চোখ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে উপসাগরীয় অঞ্চলে এসব ড্রোন মোতায়েন রয়েছে।

হরমুজ সচল করতে ‘কার্যকর পরিকল্পনা’ নিয়ে ট্রাম্প-স্টারমারের ফোনালাপ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছে। এ সময় দুই নেতা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলো যেন অবাধে চলাচল করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য একটি ‘কার্যকর পরিকল্পনা’র প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুই নেতা কথা বলেছেন। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ মিত্র দেশগুলো সফর করছেন স্টারমার। সফরের অংশ হিসেবে তিনি কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈঠক করেছেন।

ব্রিটিশ এই নেতা এর আগে বলেছিলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য কোনো ধরনের মাশুল বা টোল থাকা উচিত নয়। যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছে ইরান। এর মাধ্যমে কার্যত এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল বসানোর ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় এ পথে চলাচলকারী কিছু জাহাজ থেকে ইরান টোল সংগ্রহ করেছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

কুয়েতে হামলার খবর সত্য হলে তা ইসরায়েল অথবা যুক্তরাষ্ট্রের কাজ- ইসলামি বিপ্লবী গার্ড : ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইরনার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে গত বৃহস্পতিবার কোনো হামলা চালানোর খবর অস্বীকার করেছে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এর আগে কুয়েত অভিযোগ করেছিল যে, যুদ্ধবিরতি চললেও তেহরান ও তাদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো হামলা অব্যাহত রেখেছে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে নিঃসন্দেহে এটি জায়নবাদী শত্রু (ইসরায়েল) অথবা যুক্তরাষ্ট্রের কাজ।’

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গতকাল ড্রোন হামলায় কুয়েতের আধাসামরিক বাহিনী ন্যাশনাল গার্ডের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়েতের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া ড্রোনের বিরুদ্ধে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার ঘোষণার পর ক্ষয়ক্ষতির এ খবর পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুয়েত নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ড্রোন হামলায় দেশটির ন্যাশনাল গার্ডের একটি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ন্যাশনাল গার্ড কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীর একটি আধাসামরিক শাখা।

ইরানের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন ‘অকার্যকর’ : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা অন্তত এক ডজন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞের মতে, এসব ঘাঁটির বর্তমান অবস্থা এতটাই নাজুক যে, এগুলো এখন উপকারের চেয়ে মার্কিন বাহিনীর জন্য উল্টো ঝুঁকি তৈরি করছে। গত মাসে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে প্রথম জানানো হয়েছিল যে, ইরানের হামলার পর ঘাঁটিগুলো এখন প্রায় ‘বসবাসের অনুপযোগী’ হয়ে পড়েছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির এ ব্যাপকতার কথা স্বীকার করেনি। ওয়াশিংটনের ‘আরব সেন্টার’-এর বার্ষিক সম্মেলনে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মার্ক লিঞ্চ বলেন, ‘গত এক মাস ধরে ইরান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের অবকাঠামোগুলো অকেজো করে দিয়েছে। অথচ এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সঠিক চিত্র সামনে আসছে না।’ ২০২৩ সালের ৪ মে কুয়েত সিটির ক্যাম্প আরিফজানে এক মহড়া চলাকালে ডামি হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন সেনারা বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমান-এই ছয়টি দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশাধিকার পেন্টাগন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি গত মাসে এসব দেশের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানে হামলার জন্য ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষা দিতেই এ গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। মার্ক লিঞ্চ আরও বলেন, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ৯ হাজার সেনার আবাসস্থল এই ঘাঁটিটি এখন এতটাই অরক্ষিত যে, সেখানে নৌবহরকে আবার ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত