ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুস্থ হওয়ার পর ফের আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

সুস্থ হওয়ার পর ফের আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

সারা দেশে হামের সংক্রমণে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসছে। হাসপাতাল থেকে আংশিক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েক দিন পরই শিশুরা ফের অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং আবারও হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ এবং পরবর্তীতে সঠিক যত্নের অভাবেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা বাড়ছে।

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাজারীবাগের বাসিন্দা খাদিজার সাত মাস বয়সী শিশু আরিয়ান হাসপাতালের করিডোরে একটি বেডে চিকিৎসাধীন। খাদিজা জানান, ঈদের দুই দিন আগে আরিয়ানের হাম ও নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তখন লক্ষণ মৃদু থাকায় তিন দিনের ওষুধ দিয়ে তাকে ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার তিন দিন পরই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে বর্তমানে সে আবারও এই হাসপাতালে ভর্তি। অনবরত কাশি আর শ্বাসকষ্টে শিশুটি এখন এতটাই দুর্বল যে কিছুই খেতে পারছে না। ওয়ার্ডে বেড খালি না থাকায় করিডোরেই চলছে তার চিকিৎসা।

একই চিত্র দেখা গেছে ডিএনসিসি হসপিটালে। সেখানে ১৭ মাস বয়সী শিশু রাফসান আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকা মেডিক্যাল ঘুরে এখানে ভর্তি হওয়া এই শিশুটি একবার সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলেও ফের নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, ‘জ্বর কমলেই রোগীকে বাড়ি পাঠানো ঠিক নয়। শিশু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়পত্র দেওয়া উচিত নয়।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন যে হামের সময় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া হতে পারে। এছাড়া চোখের জটিলতা থেকে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। এজন্যই হামের রোগীদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া জরুরি। তিনি আরও জানান, হামের সময় মুখে ঘা হওয়ার কারণে শিশুরা খেতে পারে না, যা তাদের আরও দুর্বল করে দেয়। এই সময়ে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন- কলা, পেঁপে, গাজর, মাছ ও সবজি জাতীয় সুপ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী জানান, একবার হাম হলে সাধারণত দ্বিতীয়বার হয় না। তবে হাম শরীরকে এতটাই দুর্বল করে দেয়, যে অন্য কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহজে আক্রমণ করতে পারে। অনেক সময় শরীরের র‌্যাশ বা লালচে দানা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে, তাই ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তিনি সুস্থ হওয়ার পর শিশুকে নিয়মিত রোদে নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১২,৩২০ জন সম্ভাব্য হামে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ২,২৪১। এই সময়ে মোট ১৪৩ জন মারা গেছেন (সম্ভাব্য ও নিশ্চিতসহ)। একই দিন ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১,১৮৭ জন সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের।

ডিএনসিসি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ হায়দার জানান, তাদের ৩০০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ২৮০ জন ভর্তি রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৭ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলছেন, শিশুদের অকাল মৃত্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব রোধে হামের পূর্ণ চিকিৎসা এবং হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সঠিক পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৫০ : প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি বছরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকরকে বিশ্বাস বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, একই সময়ে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তবে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৪ জন। বর্তমানে রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩২ জনে। চলমান এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মোট ৪৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রামেক হাসপাতালের দেওয়া গেল এক সপ্তার তথ্য দেখা গেছে- গত বৃহস্পতিবার হামের উপসর্গ চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরআগের দিন গত বুধবার তিন শিশু, গত মঙ্গলবার এক শিশু, গত সোমবার দুই শিশু, গত রোববার দুই শিশু, গত শনিবার তিন শিশু, শুক্রবার (৩ এপ্রিল) একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গে।

চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু, যারা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া- এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে আসা জরুরি। দেরি হলে জটিলতা বাড়তে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, আক্রান্তদের পৃথক রাখা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ঝালকাঠিতে দেখা দিয়েছে হামের উপসর্গ, ২৪ ঘণ্টায় লক্ষণ নিয়ে ভর্তি ১৪ জন : ঝালকাঠিতে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ১৪ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ জনে। এখন পর্যন্ত জেলায় মোট নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ৮ বলে জানিয়েছে ঝালকাঠি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।

কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে এ পর্যন্ত ২ জন সন্দেহজনক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত হামে মৃত্যুর কোনো ঘটনা এখনো রেকর্ড হয়নি।

উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, নতুন শনাক্তদের মধ্যে নলছিটি উপজেলায় সর্বোচ্চ ১১ জন। এছাড়া সদর উপজেলায় ১ জন এবং কাঁঠালিয়া উপজেলায় ২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। রাজাপুর উপজেলায় নতুন কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ১৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হননি। একই সময়ে ৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১৩ জন।

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মেহেদী হাসান সানি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হামের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার জন্য সবাইকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে সতর্কতা জরুরি। শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সারাদেশে গত ৫ এপ্রিল একযোগে ১৮টি জেলা ও ৩০টি উপজেলায় হামণ্ডরুবেলা টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করে। এর অংশ হিসেবে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই দিন এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। ১৬ দিনব্যাপী এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২১ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ময়মনসিংহে হামের লক্ষণ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু : ময়মনসিংহে হামের লক্ষণ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৩ জন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হামের লক্ষণ নিয়ে ৭২ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। মারা যাওয়া শিশুটিকে গত ২ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিনই তাকে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে গতকাল ১০ এপ্রিল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ৩৪৪ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২৬২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। একই সময়ে মোট ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েকটি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং একই সময়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত