ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বৃষ্টির মরদেহের খোঁজ চলছে যথাযথ তদন্ত চায় বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ হওয়ার পর খুন
বৃষ্টির মরদেহের খোঁজ চলছে যথাযথ তদন্ত চায় বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির (২৭) লাশ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার লাশ খুঁজে পেতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। এনবিসি নিউজ ও স্থানীয় ফক্স ১৩ টাম্পা বে গণমাধ্যমের গত শনিবারের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। ফক্স ১৩ টাম্পা বের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তল্লাশি উদ্ধার অভিযানে ‘উই আর দ্য এসেনশিয়ালস’ নামের স্বেচ্ছাসেবীরাও যোগ দিয়েছেন।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার উদ্ধারকারী দলগুলো স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করে। তদন্তকারীরা আগে এই এলাকাতে তল্লাশি চালিয়েছিলেন। এখন মুঠোফোনের তথ্যসহ সাম্প্রতিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) ক্ষতবিক্ষত লাশ গত শুক্রবার উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফ্লোরিডার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

জামিল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। আর বৃষ্টি পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। জামিল ও বৃষ্টিকে সবশেষ ১৬ এপ্রিল টাম্পায় দেখা গিয়েছিল। তাদের খোঁজ না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ ডায়েরি হয়।

জামিল ও বৃষ্টির নিখোঁজ- মৃত্যুর ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের এক মার্কিন যুবককে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার (ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার) দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যার এই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তার মৃত্যুদণ্ড বা প্যারোল ছাড়া আজীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

ফক্স ১৩ টাম্পা বে বলছে, এ ছাড়া অন্যান্য অভিযোগেরও মুখোমুখি হচ্ছেন হিশাম। তাকে আপাতত প্রাক্?-বিচার (প্রি-ট্রায়াল) শুনানি পর্যন্ত জামিন ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। প্রাক্?-বিচার শুনানি ২৮ এপ্রিল হওয়ার কথা রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে কিংবা তাদের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তদন্তকারীরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে তারা নির্দিষ্ট তথ্য গোপন রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২ শিক্ষার্থীকে হত্যা ঘটনার যথাযথ তদন্ত-বিচার চায় বাংলাদেশ : যুক্তরাষ্ট্রে দুই শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ যথাযথ তদন্ত ও বিচার চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গতকাল রোববার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। একটি ছেলে বা একটি মেয়ে ফ্লোরিডায় নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন। ছেলেটির ডেড বডি পাওয়া গেছে, আরেকজনের ডেড বডি এখনও পাওয়া যায়নি। যেটা আমরা শুনেছি- আমাদের মন্ত্রণালয়, আমাদের ওয়াশিংটন ডিসির মিশন, বাংলাদেশ দূতাবাস স্টেট ডিপার্টমেন্ট, এফবিআই থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব এজেন্সির সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দুজনের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছি। হত্যার শিকার মেয়েটির ভাইয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি এবং লিমনের বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের পক্ষ থেকে সব সহযোগিতা করব।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তাদের যে লিগ্যাল কাজগুলো আছে, তা শেষ হলে আমরা দেখছি- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশ ফিরিয়ে আনা হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এটাতে সহযোগিতা করছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনা যায়। কিন্তু এটাতে আইনি ব্যাপার আছে, সেই জায়গাটায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে গভীরভাবে যোগাযোগ রাখছি। আমরা দাবি করবো, বাংলাদেশ থেকে এবং মন্ত্রণালয় থেকে- যাতে যুক্তরাষ্ট্র এই ইনভেস্টিগেশনটা ভালোমতো করে, দ্রুততার সঙ্গে করে এবং যারা এই নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে- সেটা বের করে যেন তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়।’ এসময় তিনি হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশি জাহাজ নিরাপদে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। এ ঘটনার ১০ দিন পর ২৪ এপ্রিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর একদিন পর ২৫ এপ্রিল বৃষ্টির ভাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তার বোনের মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে নিহত নাহিদা হত্যার দ্রুত বিচার চান তার পরিবার : যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে নিহত মাদারীপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার চান তার পরিবার ও এলাকাবাসী। সরেজমিন বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির মৃত্যুর খবরে তার গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এলাকাবাসী ও স্বজনরা হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা জহির উদ্দিন আকনের কন্যা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পিএইচডি করছিলেন। এর আগে তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘২০২৫ সালের ১২ আগস্ট উচ্চশিক্ষার জন্য আমার মেয়ে বৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রে যায়। সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল তার সঙ্গে আমাদের কথা হয়। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। পরে আমরা তার মৃত্যুর খবর পাই। আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। শিগগিরই তার লাশ দেশে ফেরত আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। ’

নিহতের চাচা দানিয়াল আকন বলেন, ‘সে বেঁচে থাকলে দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারত। কিন্তু তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’

স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃষ্টির পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করলেও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে তারা গ্রামের বাড়িতে আসতেন। তার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং বড় ভাই একজন ইঞ্জিনিয়ার। ছোটোবেলা থেকেই বৃষ্টি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। গত শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা বৃষ্টির মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। এরপর থেকেই গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমে। সবাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে শোকাহত।

নিহতের চাচাতো বোন তুলি আক্তার বলেন, ‘বৃষ্টি খুবই মেধাবী ও ভদ্র মেয়ে ছিল। সকালে তার বড় ভাইয়ের ফেসবুক পোস্ট দেখে আমরা বিষয়টি জানতে পারি। এর আগে থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। কীভাবে তাকে হত্যা করা হলো, আমরা কিছুই জানি না। আমরা এই ঘটনার সঠিক বিচার চাই।’

আরেক চাচাতো বোন ফজিলা আক্তার বলেন, ‘এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, শাস্তি এবং বৃষ্টির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব জানান, বিষয়টি তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন। এ ঘটনায় মূলত দূতাবাস কাজ করবে। পরিবার কোনো সহায়তা চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত