
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে ইরানও। পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। এতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য। সেই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় ইরান। এতে গোটা বিশ্বেই জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এভাবে টানা ৩৯ দিন ভয়াবহ এই যুদ্ধ চলে। অবশেষে গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পরবর্তীতে অনেকটা একক সিদ্ধান্তেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সাময়িক যুদ্ধবিরতির মধ্যেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কিন্তু টানা ২১ ঘণ্টা আলোচনা করেও কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি তারা। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পাঁচটি মৌলিক শর্ত নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে থাকা প্রধান পাঁচ শর্ত নিচে তুলে ধরা হলো-
পারমাণবিক কর্মসূচি : যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দিক। তবে তেহরান এ দাবিতে রাজি নয়। তার ভাষ্য, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ শুধু নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য হতে পারে, স্থায়ীভাবে নয়।
ইউরেনিয়াম মজুত : ইরানের কাছে বর্তমানে ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, এই ইউরেনিয়ামের পুরোটা যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকবে। তবে তেহরান এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
হরমুজ ও বন্দর অবরোধ : ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। অন্যদিকে ট্রাম্পের অবস্থান হলো, চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হবে না।
আটকা পড়া অর্থ : একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে আটকা পড়ে থাকা প্রায় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ : আলোচনায় ইরান এক বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার বিনিময়ে দেশ দুটিকে দিতে হবে প্রায় ২৭ হাজার কোটি (২৭০ বিলিয়ন) ডলার ক্ষতিপূরণ।
আবার আগ্রাসন হলে ‘প্রত্যাশার চেয়ে ভয়াবহ’ পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের : শত্রুপক্ষ কোনো ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশ করলে বা নতুন করে আগ্রাসন চালালে ‘প্রত্যাশার চেয়েও ভয়াবহ’ পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গতকাল রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার (আইআরএনএ) বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জোর দিয়ে বলেছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ‘শক্তিশালী ও বুদ্ধিদীপ্ত নীরবতা’ কোনোভাবেই তাদের দুর্বলতা নয়। এই সংযম যেকোনো মুহূর্তে ‘নারকীয় ঝড়ে’ রূপ নিতে পারে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘যুদ্ধবাজ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী শত্রু’ যদি কোনো ধরনের ভুল করে বা নতুন করে আগ্রাসন চালায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে আসা এই কড়া হুঁশিয়ারি নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
চাপ প্রয়োগে বা হুমকি দিয়ে ইরানকে আলোচনায় বসানো যাবে না- পেজেশকিয়ান : যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করে বা হুমকি দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, বর্তমান মার্কিন পদক্ষেপগুলো দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করছে ও সংলাপের পথ আরও জটিল করে তুলছে। পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেন, ওয়াশিংটন যদি তাদের ‘শত্রুতামূলক আচরণ ও চাপ সৃষ্টি’ বন্ধ না করে, তবে কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে সব ধরনের ‘কার্যকরী বাধা’ দূর করতে হবে। এর মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা অন্যতম। পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ফোনালাপে শাহবাজ শরিফ আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে শাহবাজ শরিফ জানান, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ সফর করায় তিনি কৃতজ্ঞ। প্রতিনিধিদলটি গতকাল শনিবার ইসলামাবাদ ছেড়ে ওমানের মাসকাটে পরবর্তী আঞ্চলিক আলোচনার উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের গত শনিবার ইসলামাবাদ সফরের কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তাদের এ সফর বাতিল করেছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজ আবার বৈঠক হতে পারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আবার পাকিস্তান যাচ্ছেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আলোচনার ক্ষেত্রে একে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, আরাগচির আবার ইসলামাবাদে আসাটা এটাই তুলে ধরছে যে, আলোচনার চেষ্টা ভেস্তে যায়নি বরং এটা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শনিবার ইসলামাবাদ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন। পরে তিনি ওমান সফরে যান। ওমানে আরাগচি দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সেই আলোচনার ফলস্বরূপ গতকাল তার ইসলামাবাদে ফেরার কথা। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার (আজ) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। একে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্য কথায়, তারা আশা করছেন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে কিছু অগ্রগতি হতে পারে এবং এটি অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে।
আকাশপথের ‘দীর্ঘ ভ্রমণের’ কারণেই ইসলামাবাদ সফর বাতিল করা হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের : দীর্ঘ সময় আকাশপথে ভ্রমণের ধকলের কথা মাথায় রেখেই পাকিস্তানে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সফর বাতিল করা হয়েছে। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ দাবি করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য এই দীর্ঘ সফর প্রয়োজনীয় ছিল না; বরং এখন থেকে ফোনে আলোচনা চালানো হবে। ফ্লোরিডায় এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘এমন একটি নথির (লিখিত প্রস্তাব) জন্য আমরা বারবার উড়োজাহাজে ১৫ ঘণ্টা করে যাওয়া-আসা করতে পারি না; যা যথেষ্ট কার্যকর নয়। তাই আমরা এখন থেকে টেলিফোনে যোগাযোগ করব। তারা (ইরান) চাইলে যেকোনো সময় আমাদের ফোন করতে পারে।’
সফরের পরিবর্তে টেলিফোনে আলাপ করার সিদ্ধান্তটি দুই পক্ষের জন্যই সহজ হবে বলে মনে করেন ট্রাম্প। এর আগে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও তাঁর জামাতা কুশনারের ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। সফর বাতিলের কারণ হিসেবে ভ্রমণের ধকলের পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্ব নিয়েও নিজের পূর্ববর্তী সংশয়ের কথা আবার উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে, যা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানি মাইন অপসারণ শুরুর দাবি যুক্তরাষ্ট্রের : বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করতে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে মার্কিন নৌবাহিনী। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ পথে ইরানের পেতে রাখা বিস্ফোরক মাইন শনাক্ত ও তা অপসারণের কাজ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি বর্তমানে অধিকাংশ জাহাজের জন্য বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে টান পড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও সমুদ্রের তলদেশ থেকে বিস্ফোরক অপসারণ করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। এই প্রণালী দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে মার্কিন বাহিনী পথটি পরিষ্কার করার দাবি করলেও সেটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিমা কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের গবেষক এমা স্যালিসবারি বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে আগের সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার একটি সীমা রয়েছে।
ইরানযুদ্ধে ব্যবহার করা যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে আগুন : যুক্তরাজ্যের গ্লুস্টারশায়ারে অবস্থিত রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। বিমানঘাঁটিটি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ও গ্লুস্টারশায়ার লাইভ এই খবর জানিয়েছে। গতকাল রোববার ভোরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি সেবা সংস্থার বেশ কয়েকটি ইউনিট মোতায়েন করা হয়। দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া রয়্যাল এয়ার ফোর্সের কোনো উড়োজাহাজের ক্ষতি হয়নি। তবে বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বিমান বাহিনীর কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এ পর্যন্ত জানা যায়নি।