
সারাদেশে বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও অন্তত দুইজন। এর মধ্যে গাইবান্ধায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুইজন, জামালপুরে দুইজন, ঠাকুরগাঁওয়ে দুইজন, বগুড়া, নাটোর ও পঞ্চগড়ে একজন করে মারা গেছেন।
গাইবান্ধার সদর, সুন্দরগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জে বজ্রপাতে এক শিক্ষার্থীসহ তিনজন মারা গেছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুইজন। পাশাপাশি বজ্রপাতে একটি গরুও মারা গেছে। গতকাল রোববার বিকেলে উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোকলেছুর রহমান মন্ডল।
বজ্রপাতে নিহতরা হলেন, দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম সুজা চৌধুরীর ছেলে ফুয়াদ (১৪), আল মোজাহিদ চৌধুরী ছোটন মিয়ার ছেলে রাফি (১২) এবং নবীন হোসেনের ছেলে মিজানুর (২০)। এ ঘটনায় আহত শামীম (১৮) একই গ্রামের আব্দুল হাই মিয়ার ছেলে। নিহত রাফি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। এ সময় ওই দুই তরুণ ও শিশু শিক্ষার্থী বাড়ির পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তাদের ওপর সরাসরি বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তারা তিনজন মারা যায়। একই সময়ে পাশে থাকা একটি গরুও মারা যায়। আহত শামীমকে স্বজনরা উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন। সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে বলেন, সুন্দরগঞ্জে বজ্রপাতে তিনজন মারা গেছে। একটি গরুও মারা গেছে এবং একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। এ ছাড়া, সদর উপজেলা ও মেলান্দহ উপজেলায় বজ্রপাতে গৃহবধূসহ আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার লক্ষীরচর ইউনিয়নের চরযথার্থপুর এলাকার হাবিবুর রহমান হাবিবের ছেলে হাসমত আলী হাসু (৫৫) ও মেলান্দহ উপজেলার হাজরাবাড়ী পৌর এলাকার কড়ইচুড়া গ্রামের রাজিব কুলির স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (২২)। গতকাল রোববার বিকেলে রাজির কুলির নিজ বাড়ি ও শরিফপুর নদী পাড়ের চরে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত মর্জিনা আক্তারের স্বামী রাজিব কুলি বলেন, রোববার বিকেলে বাড়ির উঠানে খোলা আকাশের নিচে চুলায় রান্না করছিল তার স্ত্রী মর্জিনা আক্তার। এমন সময় পাশেই বজ্রপাত হয়। এতে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান মর্জিনা। পরে বাড়ির আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। অপর আহত ব্যক্তি শেফালী বেগমকে আহত অবস্থায় জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহত হাসুর ভাই রুহুল আমীন (৪৮) বলেন, হাসু রোববার সকালে তার গৃহপালিত গরুকে ঘাস খাওয়ানোর জন্য নদী পাড়ে যান। তারপর বিকেলে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে বজ্রপাতে হাসু গুরুতর আহত হয়। তার একটি গরু মারা যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্ত (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখনো আমি কোনো তথ্য পাইনি। আপনাদের মাধ্যমেই শুনতে পেলাম। এ বিষয়ে মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবায়দুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে মর্জিনা আক্তার নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ তার মতো করে কাজ করছে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় পৃথক দুটি বজ্রপাতের ঘটনায় এক কৃষক ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে।
এর মধ্যে, তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের বেত্রাশীন গ্রামে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বজ্রপাতে আব্দুল হামিদ (৫০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। নিহত আব্দুল হামিদ ওই গ্রামের মৃত গফুর আলীর ছেলে।
তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো হাবিবুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে কৃষক মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
একই দিন বিকেল ৫টার দিকে রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের মল্লিকচান এলাকায় বজ্রপাতে হাসান শেখ (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। নিহত হাসান শেখ ওই এলাকার আব্দুল হালিম শেখের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিকেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজ জমিতে কাটা ধান এক পাশে জড়ো করছিলেন হাসান। এ সময় হঠাৎ আকাশে মেঘ জমে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয় এবং বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
রায়গঞ্জ থানা-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বজ্রপাতে এক যুবকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বগুড়ার গাবতলীতে জমি থেকে ছাগল আনতে গিয়ে বজ্রপাতে সুমন (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেলে উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের মুচিখালী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুমন মুচিখালী গ্রামের মো. আবদুল করিমের ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেল পৌনে ৪টার দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় বাড়ির পাশের একটি জমিতে থাকা নিজের ছাগল আনতে যান সুমন। কিছুক্ষণ পর বজ্রপাতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। গাবতলী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবু মুসা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, খবর পেয়ে এসআই মো. মাহবুবের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে নাটোরের সিংড়ায় চলনবিলে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে সম্রাট হোসেন (২৬) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার বিকেলে উপজেলার ঠ্যাঙ্গা পাকুরিয়া গ্রামে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সম্রাট হোসেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার নগরডালা গ্রামের সাজা ফকিরের ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্রাট হোসেনসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক ঠ্যাঙ্গা পাকুরিয়া গ্রামের মাঠে ধান কাটছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে তারা পাশেই একটি ঘরে আশ্রয় নেন। এ সময় বজ্রপাতের আঘাতে সম্রাট গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অন্য শ্রমিকরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সিরাজগঞ্জ থেকে সিংড়ায় ধান কাটতে এসে বজ্রপাতে সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের মরদেহ নাটোর সদর হাসপাতালে রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।