ঢাকা শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা

আসামিকে আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঢাকা আইনজীবী সমিতির

* পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ, কুলখানির জন্য ঢাকা ছাড়লেন বাবা-মা * রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে মিরপুরে বিক্ষোভ, যান চলাচল বন্ধ * বাসা থেকে বের হলে ভয় লাগে, নিরাপদে চলাফেরা করতে চাই
আসামিকে আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঢাকা আইনজীবী সমিতির

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামিপক্ষকে কোনো আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি। ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য যদি আসামিপক্ষকে আইনি সহায়তা দেন, তবে তার বিরুদ্ধে কার্যনির্বাহী কমিটি ও জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে জুম মিটিংয়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কালাম খান এ তথ্য জানিয়েছেন।

কালাম খান বলেন, ‘কার্যনির্বাহী কমিটির জুম মিটিং শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে সমিতির কোনো সদস্য অংশ নেবেন না। কার্যনির্বাহী কমিটির ২৩ সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা এ ধরনের অপরাধীদের একটা বার্তা দিতে চাই যে এরূপ ন্যক্কারজনক অপরাধ করলে তাদের আইনি সহায়তাও মিলবে না। কোনো আইনজীবী তাদের পক্ষে দাঁড়াবেন না। তাদের শাস্তি অনিবার্য।’ আজ শনিবার সকালে সব দপ্তরে ও বিচারকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও জানান কালাম খান। ঢাকা আইনজীবী সমিতি এ ধরনের নৃশংসতার বিচার চায় বলেও জানান তিনি।

আইনজীবী সমিতির এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য ইয়াসিন আরাফাত। ফেসবুকে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি লেখেন, এই সিদ্ধান্ত আইনত অবৈধ, অযৌক্তিক ও নীতিবহির্ভূত। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও লেখেন, প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের পছন্দমতো আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকার রয়েছে। কোনো বার অ্যাসোসিয়েশন তার সদস্যদের পেশা পরিচালনার অধিকার খর্ব করতে পারে না। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলায় একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা গত বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন দল ও সংগঠন ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে। গতকাল শুক্রবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ, কুলখানির জন্য ঢাকা ছাড়লেন বাবা-মা : রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার শিকার আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় উত্তপ্ত পুরো দেশ। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় রামিসাদের বাসার সামনে জড়ো হতে থাকেন বিক্ষুদ্ধ জনতা। ছোট-ছোট সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় স্থানীয়দের। এদিকে সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক রামিসার মা-বাবা।

দুপুর ১২টার দিকে মেয়ের কুলখানি ও মিলাদে অংশ নিতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তারা। যাওয়ার আগে বাসার সামনে জড়ো হওয়া মানুষদের কান্না আর সান্ত¡নার শব্দে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।

পরিবারের স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজদিখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের সময় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রামিসার মা এখনও মেয়ের জামাকাপড় ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন।

আর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বারবার মেয়ের শেষ আবদারের কথা মনে করে ভেঙে পড়ছেন। দুই দিন আগে মেয়ের জন্য একটি বোরকা কিনে এনেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বোরকা আর পরা হয়নি রামিসার।

রামিসার বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, বেলা ১১টার পর থেকে রামিসাদের বাসার সামনের গলিতে একে একে জড়ো হন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ। অনেকের হাতে ছিল ‘রামিসার হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’, ‘শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড।

এসময় এলাকাজুড়ে ছিল থমথমে পরিবেশ। স্থানীয়দের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া লামিয়া খানম নামে এক নারী বলেন, আমরা নিজের সন্তানদের নিয়েই এখন আতঙ্কে আছি। একটা শিশুকে এত নির্মমভাবে হত্যা কোনো মানুষ করতে পারে না। গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় নিজ বাসার পাশ থেকে নিখোঁজ হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা। পরে প্রতিবেশী সোহেল রানার ফ্ল্যাট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন।

পুলিশ জানায়, প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গোপনের চেষ্টা করেন। ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন। এ ঘটনায় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে মিরপুরে বিক্ষোভ, যান চলাচল বন্ধ : রাজধানীর পল্লবীতে রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার দ্রুত বিচার দাবিতে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

শুক্রবার (২২ মে) জুমার নামাজের পর বিক্ষোভকারীরা মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অবরোধের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা ‘জাস্টিস ফর রামিসা’, ‘ফাঁসি চাই’, ‘আমার বোন খুন হলো কেন?’, ‘ফাঁসি চাই’, ‘অপরাধীর আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাত দিন নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। দেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা বারবার ঘটছে।

বাসা থেকে বের হলে ভয় লাগে, নিরাপদে চলাফেরা করতে চাই : রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুজহাত বলেন, বাসা থেকে যখন বের হই, স্কুলে যাই, বাসায় ফিরি- ভয় লাগে। আমরা সব মেয়েরা মুক্তভাবে নিরাপদে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে চাই।

রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসাকে হত্যা ও ধর্ষণের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের সি-ব্লকে এই মানববন্ধনের আয়োজন করে পল্লীমা সংসদ। মানববন্ধনে নুজহাত বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে পত্রিকার পাতায় ধর্ষণের খবর পড়া আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এসব খবর ও ছবি বিদেশেও যায়, যা আরও লজ্জার। আমাদের আইনমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি, ওই শিশু হত্যাকাণ্ডে জড়িতের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বিচার হয়।’

পল্লীমা সংসদের সভাপতি আনিসুর রহমান লিটন বলেন, ‘পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

দ্রুততম সময়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হবে এবং সমাজের প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করতে হবে যেন।

এ ধরনের অন্যায় অনৈতিক ঘটনা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে।’

রাজধানীর এলাকাভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ধর্ষণের প্রতিবাদে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আনিসুর রহমান লিটন বলেন, ‘সামাজিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় বর্তমানে চলছে, প্রত্যেক এলাকায় এই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিতে হবে।’

সকাল ১১টায় এই মানববন্ধন শুরু হয়ে শেষ হয় ১২টা ১০ মিনিটে। এতে পল্লীমা মহিলা পরিষদ, পল্লীমা স্বাস্থ্যসেবা, পল্লীমা গ্রীন, খিলগাঁও ব্যবসায়ী ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ আটটি অঙ্গ সংগঠনের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দাসহ প্রায় ২০০ জন অংশ নেয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত