ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

একাদশে ভর্তির আবেদনই করেনি দেড় লাখ শিক্ষার্থী

একাদশে ভর্তির আবেদনই করেনি দেড় লাখ শিক্ষার্থী

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে রয়েছে ২৫ লাখের বেশি আসন। এসব আসনের অর্ধেকও এবার পূরণ হওয়ার মতো শিক্ষার্থী নেই। এর মধ্যে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করা প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদনই করেনি। ফলে রাজধানী ও বড় শহরের নামি কলেজগুলোতে পছন্দের আসন নিয়ে প্রতিযোগিতা হলেও দেশের বহু মফস্বল ও গ্রামের কলেজকে এবার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তীব্র শিক্ষার্থী সংকটের।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী। এর বিপরীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা— এই তিন বিভাগ মিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। অর্থাৎ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েও ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী এখনও উচ্চমাধ্যমিকে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় নাম লেখায়নি। পাস করেও তারা কেন একাদশে ভর্তির আবেদন করেনি, তাদের কতজন অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় যাচ্ছে কিংবা কতজন পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে, এ বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

আবার আসন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার হিসাব পাশাপাশি রাখলে পরিস্থিতির বিপরীত চিত্রও উঠে আসে। সারা দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আসন রয়েছে ২৫ লাখের বেশি। বিপরীতে ভর্তির যোগ্য শিক্ষার্থী ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন। অর্থাৎ সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী একাদশে ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক আসন খালি পড়ে থাকবে। এর বাইরে পাস করেও যারা এখনও ভর্তির আবেদন করেনি, তাদের বাদ দিলে বাস্তবে কলেজে যাওয়ার পথে থাকা শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে যায়। তবে দেশের সব কলেজে এর প্রভাব সমান নয়। রাজধানী ও বড় শহরের নামি কলেজগুলোতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পছন্দের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার প্রতিযোগিতা থাকবে। নির্দিষ্ট আসনের বিপরীতে এসব কলেজে আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ফল ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী বাছাই করতে হবে। কিন্তু শহর থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, চিত্র ততই বদলে যায়।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক কলেজের সামনে এখন আর আসন পূরণের চিন্তা নয়, বরং ন্যূনতম সংখ্যক শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে কি না সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যেসব কলেজ আশপাশের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল, সেসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে একাদশের ভর্তি ও শ্রেণি কার্যক্রমে। ফলে শহরের কলেজে যখন 'কোথায় ভর্তি হবে' তা নিয়ে প্রতিযোগিতা, তখন মফস্বল ও গ্রামের অনেক কলেজ ন্যূনতম শিক্ষার্থী মিলবে কি না সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের কলেজশিক্ষায় ধীরে ধীরে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও কলেজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কোথাও পছন্দের কলেজে একটি আসনের জন্য একাধিক শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করছে, আবার কোথাও নির্ধারিত আসনের একটি অংশ পূরণ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বৈপরীত্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে গ্রাম ও মফস্বলের কলেজগুলোতে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই আশপাশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর ফল খারাপ হলে তার প্রভাব কয়েক মাসের মধ্যেই গিয়ে পড়ে কলেজের একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমে।

চলতি বছরের ফল সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত মূল ফলে উত্তীর্ণ হয় ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। পরে পুনর্নিরীক্ষণের ফলে আরও ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করে। সব মিলিয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জনে। ফলে মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে যাওয়ার সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি যেসব এলাকায় পাসের হার তুলনামূলক কম, সেসব এলাকার কলেজগুলোতে নতুন শিক্ষার্থী পাওয়ার চাপও বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের শহরমুখী প্রবণতা। পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ স্থানীয় কলেজে না পড়ে জেলা শহর কিংবা বড় শহরের তুলনামূলক ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে চায়। ফলে একই এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে আগে যে সংখ্যক শিক্ষার্থী স্থানীয় কলেজে আসত, এখন তার একটি অংশ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এতে গ্রামীণ কলেজের শ্রেণিকক্ষ ধীরে ধীরে ফাঁকা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক বেসরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ের কলেজ শিক্ষার্থীসংখ্যার ওপর নির্ভর করে তাদের আয়-ব্যয় পরিচালনা করে। ভর্তি ও টিউশন ফি থেকে আয় কমে গেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যয় সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমতে থাকলে বিভাগ চালু রাখা, প্রয়োজনীয় শিক্ষক ধরে রাখা কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার একটি বেসরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, আমাদের এলাকায় প্রতিবছর এসএসসি ফল প্রকাশের পর একাদশে ভর্তি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থাকে। এবার সেটি আরও বেশি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত