
সম্প্রতি হামের প্রকোপ বেড়েছে। এর প্রকোপে জনমনে উদ্বেগ ও ভীতি বাড়ছে। এরইমধ্যে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। হাম ভাইরাসজনিত রোগ। এ ভাইরাসে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারে। যেসব শিশু হামের টিকা নেয়নি, যারা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে বা হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছে তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওযার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে ৬ মাসের কম বয়সি শিশু ও টিকা দেওয়ার পরও শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ঘটনাগুলো আমাদেরকে আরও ভীত করছে। হামের লক্ষণের মধ্যে জ্বর, শুকনো কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া, জ্বরের ২-৩ দিন পর গালের ভেতরের দিকে ছোট সাদা দাগ দেখা দেয়। সাধারণত ৩-৫ দিন পর মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীরে লাল ছোট ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে, যা ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ সময় শিশুর চিকিৎসা ও বিশেষ যত্নের প্রযোজন হয়। আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসার পাশাপাশি খাবারের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
হাম হলে যে যে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হয়:
১) হামে আক্রান্ত শিশুর জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, ডায়রিয়া ইত্যাদি কারনে শিশুর শরীর থেকে পানি ও তরল বের হয়ে যায় ফলে পানি শূন্যতা দেখা দেয়
২) ভাইরাসের কারণে শরীরে ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি হয়
৩) সংক্রমনে পেশি ক্ষয় হয় ফলে প্রোটিনের ঘাটতি হয়
৪) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে
৫) অনেকের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি ও জিংক এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে
হামে আক্রান্ত শিশুর দৈনিক খাবারে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। এ সময় ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন শিশুকে দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়ক হবে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশনের পাশাপাশি দৈনিক খাদ্য হতে ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য শিশুর খাবারে ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায় এমন খাবার যেমন মুরগরি মাংশ, কলিজা, মাছ, ডিম, দুধ এছাড়া হলুদ, লাল ও সবুজ রংয়ের শাক-সব্জি, ফল হতে খাদ্য নিবাচন করতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ চবিতে দ্রবনীয় হওয়ায় রান্নায় অবশ্যই তেল ব্যবহার করতে হবে। জিঙ্ক শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং যেকোন ক্ষত সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। জিঙ্ক এর ভালো উৎস মাংস, যকৃত, সয়াবিন, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, মাসরুম ইত্যাদি। জিঙ্ক-এর মতই ভিটামিন ‘সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দ্রুত আরোগ্যলাভে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সাইট্রাস ফলে ভিটামিন ‘সি’ বেশি পাওয়া যায়। কমলা, আঙ্গুর, কলা, তরমুজ, আপেল, লেবু, জামবুরা, পেয়ারা, বেদানা, তরমুজ, সব্জির মধ্যে ব্রেকলি, পালংশাক, ক্যাপসিকাম, টমেটো ইত্যাদি তাজা ফলমূল ও সব্জিতে পাওয়া যায়।
শিশুর খাবার তৈরিতে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন:
১) শিশুর জন্য অবশ্যই তার বয়স ও রোগের ধরন অনুযায়ী খাবার নির্বাচন করতে হবে। শিশুর খাবার নরম এবং সহজপাচ্য হবে। শিশুকে নরম খিচুড়ী, নরম ভাত, স্যুপ, দিতে হবে। খিচুড়ী তৈরির সময় পেঁপে, গাজর যোগ করে সুসিদ্ধ করতে হবে;
২) শিশুর শরীরে পানির ঘাটতি পূরনের জন্য তাকে বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ ও ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের প্রেক্ষিতে খাবার স্যালাইন দিতে হবে;
৩) প্রোটিনের চাহিদা পূরনের জন্য মুরগীর মাংস, মাছ, ডিম, ডাল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খাওয়াতে হবে; শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে পরিমান নিধারন করতে হবে;
৪) শিশু মায়ের বুকের দুধ পান করলে তা ঘন ঘন খাওয়াতে হবে;
৫) শিশু যদি ভাত খেতে না চায় তাহলে দুধ সুজি বা দুধ সাবুদানা দেওয়া যেতে পারে;
৬) শিশুকে ফল ছোট টুকরো করে বা ফলের রস খাওয়াতে হবে;
৭) শিশুর খাবারে অতিরিক্ত মসলা দেওয়া যাবে না;
৮) রান্নার পর বা ফল কাটার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে খাওযাতে হবে এতে পুষ্টি কম নষ্ট হবে;
৯) রান্নার তৈজসপত্র ও রান্না ঘরের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শিশুর খাবার তৈরির আগে ও শিশুকে খাওয়ানোর আগে ও পরে অবশ্যই হাত ভালোভাবে পরিস্কার করতে হবে;
৯) এ সময় শিশুকে বেশি মসলা ও ঝালযুক্ত খাবার দেয়া যাবে না;
১০) তেলে ভাজা, যেকোন প্রোসেস ও জাঙ্ক ফুড দেওয়া যাবে না;
১১) শিশুকে অল্প অল্প পরিমানে বারে বারে খাবার দিতে হবে;
১২) শিশুর এলার্জি সমস্যা বা শ্বাস কষ্ট থাকলে এলার্জি সমস্যা হয় এমন খাবার দেওয়া যাবে না;
হাম একটি সংক্রমিত রোগ তাই কোনো পরিবারে কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে বাসার অন্য সুস্থ্য শিশুর কাছ থেকে আলাদা করা এতে অন্য শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। আক্রান্ত শিশুকে আরামদায়ক, পরিস্কার কাপড় পড়ানো, পরিস্কার পরিবেশে রাখা, শিশুকে খাওয়ানোর আগে ও পরে হাত ধোয়া এবং পরিবারের সদস্যরা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে শিশুর ক্রস ইনফেকশন কমাতে সাহায্য করবে।