ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জলবায়ু পরিবর্তন

৫ বছরে ২০ ভাগ বরফ হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড

৫ বছরে ২০ ভাগ বরফ হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড

শীতকালে অপর্যাপ্ত তুষারপাত এবং এই গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রার প্রভাবে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ড মাত্র পাঁচ বছরে তার হিমবাহের বরফের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হারিয়েছে।

সুইস গ্লেসিয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্ক এবং সুইস একাডেমি অব সায়েন্সেসের সুইস কমিশন ফর ক্রায়োস্ফিয়ার অবজারভেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হাইড্রোলজিক্যাল বছরে সুইস হিমবাহগুলো তাদের বরফের আয়তনের ৫.৫ শতাংশ হারিয়েছে, যা ২০২১ সাল থেকে হিসাব করলে প্রায় ২০ শতাংশ।

কিন্তু কেন এভাবে বরফ গলছে আল্পস ঘেরা সুইজারল্যান্ডে, আর এর পরিণতিই বা দেশটির জন্য কতটা ভয়াবহ?

গ্রীষ্মের শেষভাগে বরফ গলা এবং তুষার জমার পরিমাণ পরিমাপ করতে সেপ্টেম্বর মাসে সুইজারল্যান্ডের ২৩টি হিমবাহ পরিদর্শনে যান গ্ল্যামোস-এর একদল গবেষক।

পশ্চিম সুইস আল্পসের 'স্কেক্স রুজ' নামের একটি হিমবাহ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন গ্ল্যামোস প্রধান এবং প্রতিবেদনের অন্যতম গবেষক ম্যাথিয়াস হাস। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, দলকে রেফারেন্স পয়েন্ট বা পরিমাপের নির্দিষ্ট ভিত্তি দেওয়ার জন্য জুলাই মাসে বরফের মধ্যে প্রায় চার মিটার (১৩ ফুট) উঁচু একটি পরিমাপক পোল বা খুঁটি পোঁতা হয়েছিল।

তিনি বলেন, 'সেপ্টেম্বরের শুরুতে যখন আমরা আবার সেখানে গেলাম, দেখলাম পোলটি তিন মিটার (১০ ফুট) বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ, জুন ও জুলাইয়ের দাবদাহ বাদ দিয়ে কেবল আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই প্রায় ৩,০০০ মিটার উচ্চতায় তিন মিটার বরফ গলে গেছে।'

তিনি বলেন, এটা পরিষ্কারভাবে বোঝায় যে সুইজারল্যান্ডের ছোট পর্বতগুলোর জন্য এ আবহাওয়া কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সুইজারল্যান্ডের একক হিমবাহগুলোর গড় সামগ্রিক পুরুত্ব ২.৫ থেকে চার মিটার পর্যন্ত কমেছে। হিমবাহের প্রান্তভাগে স্থলভাগ থেকে জলাশয়ে প্রসারিত হিমবাহের অংশ কিছু কিছু স্থানে ১০ মিটার পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

গ্লামোস প্রধান ম্যাথিয়াস হাস আল জাজিরাকে বলেন, সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্ম ছিল এটি। শীতকালে কম তুষারপাত হয়েছিল, তাই গরম শুরু হওয়ার সময় হিমবাহগুলো সুরক্ষিত ছিল না।

গ্ল্যামোস প্রধান বলেন, এই বিশাল বরফ ক্ষয়ের পেছনে মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্ম রেকর্ড করা হয়েছে। তার ওপর শীতকালে তুষারপাত কম হওয়ায় গরম শুরু হওয়ার সময় বরফের ওপর সুরক্ষার বাড়তি কোনো আস্তরণ ছিল না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তাদের পোলের পরিমাপ নির্দেশ করে যে, বরফ গলার প্রক্রিয়াটি সুইজারল্যান্ডের সব হিমবাহকে একইভাবে প্রভাবিত করলেও, ছোট হিমবাহগুলোতে এর প্রভাব বেশি স্পষ্ট ছিল।

ম্যাথিয়াস হাস বলেন, ছোট হিমবাহগুলো খুব দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, এমনকি কোনো কোনটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বড় হিমবাহগুলো বিপুল পরিমাণ বরফ হারালেও তা দেখতে এখনও বেশ বিশাল।

প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানান, শুধু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই হিমবাহগুলো প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন লিটার পানি হারিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি সুইজারল্যান্ডের সব পরিবারের পুরো এক বছরের পানীয় জলের ব্যবহারের চেয়েও চার গুণ বেশি, যা দেশটির ভবিষ্যতে পানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।

ম্যাথিয়াস বলেন, এটি কেবল পর্যটনেই প্রভাব ফেলছে না, বরঞ্চ আমাদের পর্বতের রূপই বদলে দিচ্ছে। সাদা শুভ্র পর্বতগুলো এখন ধীরে ধীরে ধূসর আর কালো হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির স্বার্থে হিমবাহ থেকে পাওয়া পানির ভূমিকাও অপরিসীম। তিনি বলেন, হাইড্রো পাওয়ার লেকগুলোতে পানি ধরে রেখে আমরা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, যা পুরো ইউরোপের বড় বড় নদীতে পানির প্রবাহ বজায় রাখে। হিমবাহগুলো এখনো টিকে আছে বলে আমরা এই পানি পাচ্ছি, তবে এই সুবিধা বেশি দিন থাকবে না।

ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলসের পানি ও জলবায়ু বিভাগের গ্লেসিওলজিস্ট এবং সহযোগী গবেষণা অধ্যাপক হ্যারি জেকোলারিও একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেছেন।

অধ্যাপক হ্যারি জেকোলারি বলেন, হিমবাহগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পানি সরবরাহকারী। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত ও শুষ্ক সময়ে হিমবাহগুলো পানি যোগায়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত